ইউক্রেনের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড়। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী এবং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আন্দ্রি ইয়েরমাক পদত্যাগ করেছেন। দেশটির শীর্ষ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো ইয়েরমাকের বাসভবনে নজিরবিহীন অভিযান চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, আজ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার চিফ অফ স্টাফের পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের প্রশাসনিক কাঠামোতে এই ঘটনাকে একটি বড়সড় ‘পলিটিক্যাল আর্থকquake’ বা রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জেলেনস্কির ‘ছায়া’ ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু
রাষ্ট্রপতির চিফ অফ স্টাফ হিসেবে আন্দ্রি ইয়েরমাক কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং তাকে ইউক্রেনের ‘ডি ফ্যাক্টো’ বা কার্যত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জেলেনস্কির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। বিশেষ করে, চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি ছিলেন সম্মুখসারির নেতা। জেনেভায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে সদ্য সমাপ্ত উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ‘পিস প্ল্যান’ বা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ৫৪ বছর বয়সি ইয়েরমাক। এমন এক ক্রান্তিকালে তার বিদায় কিয়েভের কূটনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার সাঁড়াশি অভিযান
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর)। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে যখন কিয়েভের অত্যন্ত স্পর্শকাতর শান্তি আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ইয়েরমাকের ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টে হানা দেয় ইউক্রেনের দুটি প্রধান তদন্তকারী সংস্থা—ন্যাশনাল অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো (NABU) এবং স্পেশাল অ্যান্টি-করাপশন প্রসিকিউটরস অফিস (SAPO)।
ন্যাবু (NABU) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আদালতের সুনির্দিষ্ট ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ বা অনুমোদন নিয়েই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে বিরত থেকেছে সংস্থাটি, তবে এই ঘটনা প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিয়েভের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
জেলেনস্কির ‘রিবুট’ বার্তা ও পদত্যাগ নিশ্চিতকরণ
সাম্প্রতিক সময়ে জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহলে একাধিক ‘করাপশন স্ক্যান্ডাল’ বা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যদিও খোদ প্রেসিডেন্ট বা তার প্রধান সহকারী ইয়েরমাকের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠেনি, তবুও সমালোচক এবং পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোর চাপে প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
শুক্রবার নিজের নিয়মিত সান্ধ্যকালীন টেলিভিশন ভাষণে জেলেনস্কি স্পষ্ট ভাষায় প্রশাসনের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “আমি চাই আজ ইউক্রেন প্রশাসন নিয়ে কারোর মনে কোনো প্রশ্ন বা সংশয় না থাকুক। তাই আমরা অভ্যন্তরীণভাবে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথমত, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে নতুন করে সাজানো হবে বা ‘রিবুট’ করা হবে। কার্যালয়ের প্রধান আন্দ্রি ইয়েরমাক ইতিমধ্যে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।”
ইয়েরমাকের প্রতিক্রিয়া ও তদন্তে সহযোগিতা
পদত্যাগের বিষয়ে আন্দ্রি ইয়েরমাক এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও, বৃহস্পতিবার তার বাড়িতে অভিযানের সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ন্যাবু এবং সাপোর কর্মকর্তারা তার বাসায় ‘প্রসিডিউরাল অ্যাক্টিভিটিস’ বা প্রক্রিয়াগত তৎপরতা চালাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, তদন্তকারীদের তার অ্যাপার্টমেন্টে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং তার আইনজীবীদের উপস্থিতিতেই যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। তদন্তের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পশ্চিমা বিশ্বের আস্থা ধরে রাখতে জেলেনস্কিকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ইয়েরমাকের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির পদত্যাগ প্রমাণ করে যে, কিয়েভ এখন অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।