ক্রিকেট বিশ্ব সাক্ষী থাকল এক নতুন ইতিহাসের। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটের ‘ম্যাক্সিমাম’ বা ছক্কার রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছিলেন পাকিস্তানের ‘বুম বুম’ খ্যাত শহিদ আফ্রিদি। রবিবার (৩০ নভেম্বর) রাঁচির হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে সেই ১৫ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ছক্কার মালিক বনে গেলেন ভারতীয় অধিনায়ক রোহিত শর্মা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ‘হিটম্যান’ খ্যাত রোহিত কেবল বোলারদের শাসনই করেননি, নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়।
রাঁচিতে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
ম্যাচের শুরুতেই টস জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে আমন্ত্রণ জানায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে প্রোটিয়া অধিনায়কের এই সিদ্ধান্ত যে বুমেরাং হতে চলেছে, তা বোঝা যায় ভারতীয় ওপেনারদের শরীরী ভাষায়। এদিন ওপেনিংয়ে নেমে শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিলেন রোহিত। ৫১ বলে ৫৭ রানের এক ঝকঝকে ইনিংস উপহার দেন তিনি। এই ইনিংসটি খেলার পথেই তিনি স্পর্শ করেন সেই কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক। ৫টি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারির পাশাপাশি ৩টি বিশাল ছক্কা হাঁকান রোহিত, যার মাধ্যমে তিনি শহিদ আফ্রিদিকে টপকে ওয়ানডে ক্রিকেটের ‘সিক্সার কিং’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রোহিতের এই রেকর্ড গড়ার দিনে ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়িয়েছেন বিরাট কোহলিও। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫২তম সেঞ্চুরি (১২০ বলে ১৩৫ রান) তুলে নিয়ে ভারতকে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩৪৯ রানের বিশাল সংগ্রহ এনে দেন তিনি।
পরিসংখ্যানের আয়নায় ‘হিটম্যান’-এর দাপট
পরিসংখ্যান বলছে, রেকর্ডটি ভাঙতে রোহিতের লেগেছে আফ্রিদির চেয়ে অনেক কম ম্যাচ। ২৭৭ ম্যাচের ২৬৯ ইনিংসে রোহিতের ছক্কার সংখ্যা এখন ৩৫২টি। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানো শহিদ আফ্রিদি ৩৯৮ ম্যাচের ৩৬৯ ইনিংসে হাঁকিয়েছিলেন ৩৫১টি ছক্কা। অর্থাৎ, আফ্রিদির চেয়ে ঠিক ১০০টি ইনিংস কম খেলেই এই বিশ্বরেকর্ড নিজের করে নিলেন বর্তমান ভারত অধিনায়ক।
রোহিতের এই অর্জন তার অবিশ্বাস্য ‘Conversion Rate’ এবং পাওয়ার হিটিং সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। বিশেষ করে আধুনিক ক্রিকেটে যখন বোলাররা প্রতিনিয়ত নতুন ভেরিয়েশন আনছেন, তখন রোহিতের এই ধারাবাহিকতা সত্যিই বিস্ময়কর।
ক্যারিয়ারের অবিশ্বাস্য বিবর্তন
রোহিতের ক্যারিয়ার গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এক অদ্ভুত রূপান্তর। ক্যারিয়ারের শুরুতে বল সীমানা ছাড়া করার ক্ষেত্রে তার বিশেষ কোনো খ্যাতি ছিল না। জয়পুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজের তৃতীয় ইনিংসে প্রথম ছক্কাটি হাঁকিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ৪০তম ইনিংসে প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়া পর্যন্ত ১০২৩ বল খেলে তার ব্যাট থেকে এসেছিল মাত্র ৫টি ছক্কা।
তবে ‘হিটম্যান’-এর আসল রূপান্তর শুরু হয় ২০১৩ সালে। বেঙ্গালুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক ইনিংসে ১৬টি ছক্কা হাঁকিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি, যা ছিল তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। সেই ম্যাচেই ক্যারিয়ারের তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির প্রথমটি তুলে নেন রোহিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ১০২ ইনিংসে তার ছক্কা ছিল মাত্র ৩৬টি (প্রতি ১০২.১৪ বলে একটি)। কিন্তু পরবর্তী ১৬৭ ইনিংসে তিনি হাঁকিয়েছেন ৩১৬টি ছক্কা, যেখানে গড়ে প্রতি ২৭.৩৫ বলে একটি করে ছক্কা এসেছে। এই সময়ে ১৫০-এর বেশি ছক্কা মেরেছেন আর মাত্র দুজন—জস বাটলার (১৭১) এবং ইয়ন মরগান (১৫৫)।
অধিনায়কত্ব এবং আগ্রাসী মনোভাব
২০২২ সালে তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর রোহিতের ব্যাটিংয়ে আরও ক্ষুরধার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ‘Captaincy’র দায়িত্ব তাকে চাপে ফেলার বদলে আরও মুক্তভাবে খেলতে সাহায্য করেছে। অধিনায়ক হিসেবে গত ৪৬ ইনিংসে তিনি হাঁকিয়েছিন ১০৭টি ছক্কা, যেখানে প্রতি ছক্কা এসেছে মাত্র ১৭.৬৯ বলে। এটি আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ‘Powerplay’ এবং ডেথ ওভারে তার আধিপত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ।
অধরা রেকর্ড ও আগামীর প্রজন্ম
শহিদ আফ্রিদির রেকর্ড ভাঙতে রোহিতের সময় লেগেছে ১৫ বছর। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, রোহিতের এই রেকর্ড অদূর ভবিষ্যতে ভাঙার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বর্তমানে ‘Active Cricketers’-এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ ছক্কা জস বাটলার (১৮২) ও বিরাট কোহলির (১৫৯)। দুজনেই ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, ৩০ বছরের কম বয়সী ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছক্কা আফগানিস্তানের রহমানউল্লাহ গুরবাজের—যার ঝুলিতে রয়েছে মাত্র ৭০টি ছক্কা। ফলে রোহিত শর্মার এই ‘মহা-রেকর্ড’ আগামী কয়েক দশকে অক্ষত থাকলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।