• আন্তর্জাতিক
  • হাড়কাঁপানো শীতে ফেলে যাওয়া হলো নবজাতককে, সারা রাত পাহারায় ‘মানবতা’র নজির গড়ল একপাল কুকুর

হাড়কাঁপানো শীতে ফেলে যাওয়া হলো নবজাতককে, সারা রাত পাহারায় ‘মানবতা’র নজির গড়ল একপাল কুকুর

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
হাড়কাঁপানো শীতে ফেলে যাওয়া হলো নবজাতককে, সারা রাত পাহারায় ‘মানবতা’র নজির গড়ল একপাল কুকুর

নদীয়ার নবদ্বীপে অবিশ্বাস্য ঘটনা; মানুষের নিষ্ঠুরতাকে হার মানাল অবলা প্রাণীর মমত্ববোধ, স্থানীয়দের চোখে বিস্ময়

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপ শহর তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হাড়কাঁপানো শীতের রাত, ঘন কুয়াশায় মোড়া চারপাশ। ঠিক ভোরের আগের সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে শহরের এক প্রান্তে যখন মানবতা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হলো প্রকৃতি। রেলওয়ে কর্মীদের কলোনির একটি বাথরুমের বাইরের হিমশীতল মেঝেতে ফেলে যাওয়া হয়েছিল সদ্যোজাত এক শিশুকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মানুষ তাকে পরিত্যাগ করলেও, পরম মমতায় তাকে আগলে রাখল একপাল বেওয়ারিশ কুকুর।

রক্তমাখা শরীর ও একপাল ‘সাইলেন্ট গার্ডিয়ান’

শিশুটির বয়স তখন মাত্র কয়েক ঘণ্টা। জন্মের রক্তের দাগ তখনও তার শরীরে স্পষ্ট। গায়ে নেই কোনো শীতবস্ত্র বা কম্বল, নেই পরিচয়লিপি বা কোনো চিরকুট। এমন এক অসহায় অবস্থায় শিশুটির বাঁচার কথা ছিল না। কিন্তু স্থানীয়রা সকালে উঠে যে দৃশ্য দেখলেন, তা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

সচরাচর যে কুকুরগুলোকে মানুষ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দেয়, সেই রাস্তার কুকুররাই সেদিন রাতে হয়ে উঠেছিল শিশুটির ‘গার্ডিয়ান’। তারা কেউ ঘেউ ঘেউ করেনি, কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেনি। বরং পরম মমতায় ও সতর্কবস্থায় গোল হয়ে ঘিরে রেখেছিল শিশুটিকে। যেন তারা বুঝতে পেরেছিল, এই ছোট্ট প্রাণটি তীব্র শীতের সঙ্গে ‘সারভাইভাল’ বা বাঁচার লড়াই চালাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সারা রাত কুকুরগুলো কাউকে বা অন্য কোনো হিংস্র প্রাণীকে শিশুটির ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে বিস্ময় ও শিহরণ

সকালে ঘুম ভাঙতেই স্থানীয় বাসিন্দা শুক্লা মণ্ডল এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি বলেন, “ঘুম থেকে উঠে যা দেখলাম, তাতে এখনও আমার শরীর শিউরে উঠছে। কুকুরগুলো মোটেই আগ্রাসী ছিল না। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা কোনো এক পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে। শিশুটি বাঁচার জন্য লড়ছে, এটা যেন তাদের ‘ইনস্টিনক্ট’ বা সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে তারা বুঝে গিয়েছিল।”

আরেক বাসিন্দা সুভাষ পাল ভোরের দিকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম পাশের কোনো বাড়িতে হয়তো বাচ্চা কাঁদছে। কিন্তু কল্পনাও করিনি যে, এই তীব্র শীতে বাইরে মাটিতে এক নবজাতক পড়ে আছে, আর তাকে পাহারাদার বা ‘সিকিউরিটি’র মতো রক্ষা করছে একপাল কুকুর।”

উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান অবস্থা

শুক্লা মণ্ডল ধীরে ধীরে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেলে কুকুরগুলো তাদের সুরক্ষা বলয় বা বৃত্ত শিথিল করে সরে দাঁড়ায়, যেন তারা মানুষের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করছে। শুক্লা দ্রুত নিজের ওড়না দিয়ে শিশুটিকে জড়িয়ে নেন এবং প্রতিবেশীদের সাহায্যে ‘রেসকিউ অপারেশন’ শুরু করেন। শিশুটিকে প্রথমে মহেশগঞ্জ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তবে দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডায় থাকায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে বা ‘মেডিকেল অবজারভেশন’-এ রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে সম্ভবত ফেলে যাওয়া হয়েছিল।

পুলিশি তদন্ত ও সামাজিক বার্তা

নবদ্বীপ থানার পুলিশ এবং চাইল্ড হেল্প লাইন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কলোনির বা আশপাশের এলাকার কেউ রাতের অন্ধকারে পরিচয় গোপন করে শিশুটিকে ফেলে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় সোর্স ব্যবহার করে দোষীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তবে প্রশাসনিক তৎপরতার বাইরেও এই ঘটনা স্থানীয় মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছে। তথাকথিত সভ্য মানুষের নিষ্ঠুরতার বিপরীতে প্রশিক্ষণহীন, অবহেলিত কুকুরগুলোর এই মানবিক আচরণ এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে সমাজের বিবেকের সামনে। স্থানীয় এক রেলকর্মীর আক্ষেপ, “এদের আমরা রাস্তার কুকুর বলি, ঘৃণা করি। কিন্তু আজ তারা সেই মানুষের চেয়েও অনেক উঁচুদরের ‘হিউম্যানিটি’ দেখাল, যে বা যারা নিজের সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে গেছে।”

Tags: viral story stray dogs newborn rescue miracle in nadia humanity story animal instinct west bengal news navadwip incident abandoned baby emotional news