জীবিকার তাগিদে খুব অল্প বয়সেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সংসারের গুরুদায়িত্ব। স্বপ্ন ছিল পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই চার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ময়মনসিংহের তরুণ হাসান বাবু (২০)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে প্রবাস জীবনের লড়াই থামল মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায়। সৌদি আরবের জেদ্দায় গাড়ি চালানো অবস্থায় প্রাণ হারালেন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
সোমবার (২০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোররাত ৫টার দিকে জেদ্দা শহরে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। হাসান বাবু ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারি ইউনিয়নের কুরচাই গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে।
ভোররাতের ট্র্যাজেডি: যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসান বাবু জেদ্দায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ‘প্রাইভেট কার ড্রাইভার’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সোমবার ভোরে তিনি কোম্পানির গাড়ি নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বের হন। ভোররাত ৫টার দিকে জেদ্দা শহরের ব্যস্ত সড়কে তার গাড়িটির সঙ্গে অজ্ঞাতনামা একটি দ্রুতগামী যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, ঘটনাস্থলেই (Spot Dead) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাসান।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার মরদেহ উদ্ধার করে। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য মরদেহটি স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
স্বপ্নভঙ্গ ও পরিবারের আহাজারি
হাসান যখন প্রবাসে যান, তখন তিনি ছিলেন নিতান্তই কিশোর। বিগত চার বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের চাকা সচল রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবারে এখন শুধুই শূন্যতা। নিহতের বাবা জামাল উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটা চার বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিল। ও চেয়েছিল আমাদের কষ্ট দূর করতে। সোমবার ভোরেও সে ডিউটিতে বের হয়েছিল, কিন্তু আর ফিরল না। আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।”
হাসানের মা ফাতেমা বেগম ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, “আমার ছেলে আমাদের সুখের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। আজ তাকে হারালাম। দুপুরে তার এক সহকর্মী (Colleague) ফোন করে যখন মৃত্যুর খবরটি দিল, তখন মনে হলো আমার পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে।”
প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সড়ক দুর্ঘটনা
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে যারা ‘ড্রাইভিং প্রফেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। হাসান বাবুর মতো হাজারো তরুণ রেমিট্যান্স যোদ্ধা দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। তার অকাল মৃত্যুতে নিগুয়ারি ইউনিয়নের কুরচাই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে যত দ্রুত সম্ভব এই রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছাবে, এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।