মাত্র এক মৌসুম আগের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল লিভারপুল, আর সেই রাজত্বের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও অ্যাসিস্ট প্রদানকারী হিসেবে ছিলেন পাদপ্রদীপের আলোয়। কিন্তু ফুটবল বিধাতা যেন পাশার দান উল্টে দিয়েছেন। সেই একই অ্যানফিল্ডে এখন উপেক্ষিত ‘মিশরীয় রাজা’। দলের ব্যর্থতার দায়ভার চাপানো হচ্ছে তার কাঁধেই—এমন অভিযোগ তুলে এবার ক্লাবের ম্যানেজমেন্ট ও কোচ আর্না স্লটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন সালাহ। নিজেকে ‘Scapegoat’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে উল্লেখ করে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন—অলরেডদের সঙ্গে তার সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়তে চলেছে।
বিস্ফোরক অভিযোগ ও উপেক্ষার যন্ত্রণা
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) ইএসপিএনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ক্লাবের অন্দরমহলের অশান্তির কথা প্রকাশ্যে আনেন সালাহ। প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলের চলতি মৌসুমের পারফরম্যান্স অত্যন্ত নাজুক। ১৫ ম্যাচ শেষে ২৩ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের অষ্টম স্থানে ধুঁকছে তারা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ তো দূর, আগামী মৌসুমের ইউরোপা লিগে (Europa League) খেলা নিয়েও দেখা দিয়েছে ঘোর সংশয়।
এই পরিস্থিতির জন্য সালাহকে দায়ী করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি টানা ৯০ মিনিট বেঞ্চে বসে কাটিয়েছি। আমার ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা এবারই প্রথম। তিনবার এমন হলো। আমি ভীষণ হতাশ। এত বছর ধরে ক্লাবের জন্য এত কিছু করলাম, অথচ মনে হচ্ছে ক্লাব আমাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে। দলের এই অবস্থার জন্য কেউ একজন আমাকে আর চাইছে না।”
‘স্টার্টিং ইলাভেন’ থেকে বেঞ্চে নির্বাসিত
২০১৭ সালে লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর থেকে দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন সালাহ। টানা ৫৩টি লিগ ম্যাচে শুরুর একাদশে থাকার রেকর্ড গড়া এই ফরোয়ার্ডের জন্য বেঞ্চে বসে থাকাটা অবিশ্বাস্য। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েস্ট হ্যাম ও সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে স্কোয়াডেই জায়গা হয়নি তার। সর্বশেষ লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে স্কোয়াডে ফিরলেও পুরোটা সময় বেঞ্চ গরম করতে হয়েছে।
লন্ডন স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট হ্যামের ম্যাচের পর থেকেই কোচের সঙ্গে তার দূরত্ব দৃশ্যমান হয়। সালাহ বলেন, “গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময় ক্লাব আমাকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন আমি বেঞ্চে। তারা কথা রাখেনি।”
স্লটের সঙ্গে সম্পর্ক ও ‘ইগো’র লড়াই
লিভারপুলের ডাগআউটে আর্না স্লট আসার পর থেকেই সালাহর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। সাক্ষাৎকারে সালাহ অকপটে স্বীকার করেছেন, কোচের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, “আমার (স্লটের) সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল, কিন্তু এখন আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই। আমি এর কারণও জানি না। মনে হচ্ছে, আমাকে দল থেকে বের করে দেওয়ার জন্যই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।”
দলের পারফরম্যান্স খারাপ হলে সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব নিতে রাজি সালাহ, কিন্তু অন্যায্য সমালোচনা তিনি মেনে নিতে নারাজ। তার ভাষায়, “আমি যদি অন্য কোনো ক্লাবে থাকতাম, তবে ক্লাব তার তারকা খেলোয়াড়কে ‘প্রটেকশন’ দিত। কিন্তু এখানে সালাহকেই সমস্যা মনে করা হচ্ছে। আমি মনে করি না আমি সমস্যা। একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য আমাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হবে না, কারণ সেটা আমি পারফরম্যান্স দিয়েই অর্জন করে নিয়েছি।”
পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা
লিভারপুলের জার্সিতে ৪২০ ম্যাচে ২৫০ গোল করা সালাহ ক্লাবের জীবন্ত কিংবদন্তি। গত এপ্রিলে দুই বছরের জন্য চুক্তি নবায়নও করেছিলেন। ভেবেছিলেন অ্যানফিল্ডেই বুটজোড়া তুলে রাখবেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ১৮ ম্যাচে মাত্র ৫ গোল এবং দলের সার্বিক ব্যর্থতা সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে।
সালাহ আক্ষেপ করে বলেন, “মাত্র পাঁচ মাস আগেও আমি পুরস্কার জিতছিলাম। এখন কেন এই দশা? দলে অনেকেই ফর্মে নেই, কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে শুধু আমাকেই। প্রশ্নটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়—কেন সবকিছুর শেষটা এমন হতে হবে?”
বিদায়ের সুর ও অ্যানফিল্ডে শেষ ম্যাচ?
সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে সালাহ যা বলেছেন, তা লিভারপুল সমর্থকদের জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। আগামী শনিবার ঘরের মাঠে ব্রাইটনের মুখোমুখি হবে লিভারপুল। এরপরই আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সে (AFCON) যোগ দিতে মিশর জাতীয় দলের হয়ে দেশ ছাড়বেন তিনি।
সালাহ বলেন, “আমি মা-বাবাকে ফোন করে বলেছি ব্রাইটনের ম্যাচটা দেখতে আসতে। আমি খেলি বা না খেলি, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি শুধু অ্যানফিল্ডের পরিবেশটা উপভোগ করতে চাই এবং সমর্থকদের বিদায় জানাতে চাই। কারণ আফ্রিকা কাপ থেকে ফিরে কী হবে, তা আমি জানি না।”
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সালাহর এই বক্তব্য আসন্ন জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোতে (Transfer Window) দল ছাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। সতীর্থদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট থাকলেও, ম্যানেজমেন্ট ও কোচের সঙ্গে এই ‘টক্সিক’ সম্পর্কের জেরে অ্যানফিল্ডে সালাহ-যুগের অবসান এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।