এই কবরস্থানে যারা নাম-পরিচয়হীন অবস্থায় শুয়ে আছেন তাদের পরিচয় তখন যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তাদের পরিচয় উদঘাটন করা জাতির কাছে আমাদের একটি দায়িত্ব। আজ সেই মহান কাজের সূচনা হলো।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার (ইউএনএইচআর) মাধ্যমে আর্জেন্টিনা থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফন্ডি ব্রাইডার ঢাকায় এসে পুরো কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি গত ৪০ বছরে ৬৫টি দেশে একই ধরনের অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
সিআইডিপ্রধান আরও বলেন, মিনেসোটা প্রোটোকল অনুসরণ করে কবর উত্তোলন, পোস্টমর্টেম, ডিএনএ স্যাম্পলিংসহ প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হবে। আমরা সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা মেডিকেল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ডিএমপি, বিভাগীয় কমিশনারসহ সব স্টেকহোল্ডারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
কবর উত্তোলন থেকে পুনঃদাফন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ধাপ সব কার্যক্রম করা হবে জানিয়ে মো. ছিবগাতউল্ল্যাহ বলেন, আবেদন অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১১৪টি কবর চিহ্নিত হয়েছে, যা বাস্তবে কমবেশি হতে পারে।মৃতদেহ উত্তোলনের পর পোস্টমর্টেম, বোন স্যাম্পল/টিস্যু সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হবে।পরিচয় নিশ্চিত হলে ধর্মীয় সম্মান বজায় রেখে আবার পুনঃদাফন করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিচয় শনাক্তের পর কেউ যদি লাশ গ্রহণ করতে চান তাহলে গ্রহণ করতে পারবেন।
এখন পর্যন্ত কত জন লাশের জন্য আবেদন করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ১০ জন স্বজন আবেদন করেছেন, আরও কেউ থাকলে সিআইডিতে যোগাযোগ করতে পারবেন। সিআইডি হটলাইনে যোগাযোগ করলে স্বজনদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হবে।
সিআইডিপ্রধান বলেন, আমরা জানি না কোন কবরে কে আছেন। তাই সময় কত লাগবে বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—এই প্রক্রিয়ায় সব শহীদের পরিচয় আমরা বের করতে পারব।
সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে সিআইডিপ্রধান সাংবাদিকদের অনুরোধ করে বলেন, আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী মৃতদেহের কোনো ছবি বা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট কাজ। আপনাদের আগের মতোই সহযোগিতা চাই।
পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক বাবা-মা, ভাই–বোন বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাদের আপনজনদের পরিচয় জানার জন্য। আমরা যেন এই জাতীয় বেদনার দায় থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ১১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
আর এটি আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনেই করা হবে জানিয়েছেন সিআইডির প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাতউল্ল্যাহ। রোববার (৭ ডিসেম্বর) মোহাম্মদপুরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উত্তোলনের সূচনালগ্নে তিনি এ কথা জানান।
সিআইডিপ্রধান বলেন, আনাসের মতো যারা বুকের রক্ত ঢেলে দেশের জন্য রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
এ সময় ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস (ইউএনএইচআর) আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফন্ডি ব্রাইডার বলেন, আমি গত তিন মাস ধরে সিআইডির সঙ্গে কাজ করছি। আন্তর্জাতিক মানের এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি এই কাজ আন্তর্জাতিক ফরেনসিক মানদণ্ড ফলো করে করা হবে। আন্তর্জাতিক রুলস ফলো করে আমরা লোকাল সংস্থাকে (সিআইডি) সহায়তা করা হবে।
স্বৈরাচার হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক রক্তাক্ত বা গুলিবিদ্ধ মৃতদেহকে অজ্ঞাতপরিচয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেসময়ই তৎকালীন প্রশাসনের লাশ লুকোনোর বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন ওঠে।
হাসিনার পতনের পর এসব লাশের পরিচয় শনাক্তে বিভিন্ন তরফ থেকে দাবি ওঠে। এরপর গত ৪ আগস্ট পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ১১৪টি লাশ উত্তোলনের নির্দেশ দেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।