দেশের বাজারে কৃষি পণ্যের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য (Fair Price) নিশ্চিত করতে বড়সড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ভারত থেকে স্থলপথে সব ধরনের পণ্য আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) কুমিল্লা সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি স্পষ্ট করেন, মার্কেটে পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ (Oversupply) কমানোই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
বাজার দর ও কৃষকের হাহাকার: কঠিন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে
উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম এতটাই কমে গেছে যে, কৃষকরা তাদের উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এই ‘প্রাইস ক্র্যাশ’ (Price Crash) ঠেকাতে সরকার তাৎক্ষণিক কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। পণ্যের দাম যাতে আর কোনো অবস্থাতেই নিচের দিকে না নামে, সেজন্য আমরা মাল্টিপল স্ট্র্যাটেজি বা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। এর অংশ হিসেবেই ভারত থেকে স্থলপথে যেসব পণ্য আমদানি হতো, তা আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।” সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশীয় উৎপাদনকারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণে ‘ডাবল অ্যাকশন’
শুধুমাত্র আমদানি বন্ধই নয়, অভ্যন্তরীণ বাজার বা ‘ডোমেস্টিক মার্কেট’ স্থিতিশীল রাখতে সরকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তা হলো—খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত রাখা। উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেন, বাজারে যখন পণ্যের আধিক্য থাকে, তখন সরকারিভাবে কম দামে চাল বা খাদ্যশস্য বিতরণ করলে মূল বাজারে দাম আরও পড়ে যায়।
তিনি বলেন, “মার্কেটে যেন পণ্যের অতিরিক্ত সাপ্লাই বা সরবরাহ বেড়ে না যায়, সেজন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকার এখন উল্টো মার্কেট থেকে ধান-চাল কিনছে। এই সরকারি কেনাকাটা বা Procurement-এর ফলে বাজারে চাহিদা (Demand) তৈরি হবে এবং দামটা একটা স্টেবল (Stable) বা স্থিতিশীল পর্যায়ে আসবে।”
তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, এই কর্মসূচি একেবারে বন্ধ হচ্ছে না। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পেলে, আগামী দুই মাস পর থেকে আবারও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করা হবে।
মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী বৈঠক
এর আগে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন খাদ্য উপদেষ্টা। সেখানে তিনি ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের গতিবিধি এবং স্থানীয় বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (DC) মু. রেজা হাসানসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সরকারের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বা ‘রুরাল ইকোনমি’-তে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।