অর্থ পাচারের নিত্যনতুন কৌশলের ভিড়ে এবার সামনে এল ‘ক্রস বর্ডার’ টিকিটিং জালিয়াতি। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে বসে টিকিট বিক্রি, অথচ ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশের ‘আইডি’—এমনই অভিনব কায়দায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে সায়মন ওভারসিজ লিমিটেড নামক একটি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসফিয়া জান্নাত সালেহর বিরুদ্ধে ওঠা এই Money Laundering-এর অভিযোগ তদন্তে নেমেছে খোদ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তলব করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই জালিয়াতির মাধ্যমে দেশ বিপুল পরিমাণ Foreign Currency বা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
১৬ কোটি টাকার ‘ডিজিটাল’ জালিয়াতি ও মন্ত্রণালয়ের নোটিশ
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সায়মন ওভারসিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আড়ালে মূলত অর্থ পাচারে লিপ্ত ছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি Show Cause Notice বা কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে এমডি আসফিয়া জান্নাত সালেহর কাছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা Audit Statement পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ৪ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২১ আগস্ট পর্যন্ত সায়মন ওভারসিজ বিধিবহির্ভূতভাবে ১ হাজার ৮৯৪টি এয়ার টিকিট ইস্যু করেছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। অভিযোগ, এই বিশাল অঙ্কের টাকা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি, বরং বিদেশের মাটিতেই লেনদেন হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে এই ‘ক্রস বর্ডার’ সিন্ডিকেট
সাধারণত, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো Global Distribution System (GDS) ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি করে। প্রতিটি এজেন্সির জন্য নির্দিষ্ট একটি কান্ট্রি-স্পেসিফিক আইডি থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিএস আইডি ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি হলে সেই অর্থ বাংলাদেশে জমা হওয়ার কথা এবং তা National Reserve-এ যুক্ত হওয়ার কথা।
কিন্তু সায়মন ওভারসিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তাদের বাংলাদেশের ‘আইএটিএ’ (IATA) জিডিএস আইডিটি অবৈধভাবে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপের বিভিন্ন এজেন্টের কাছে শেয়ার করেছে। বিদেশের যাত্রীরা সেখানে টিকিটের মূল্য পরিশোধ করেছেন, কিন্তু টিকিট ইস্যু হয়েছে বাংলাদেশের সার্ভার ব্যবহার করে। ফলে, টিকিট বিক্রির অর্থ বিদেশেই থেকে গেছে, যা সরাসরি Capital Flight বা অর্থ পাচারের শামিল।
একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ীর মতে, এটি একটি অত্যন্ত চতুর প্রক্রিয়া। যাত্রীরা বাংলাদেশ বা তৃতীয় কোনো দেশে ভ্রমণের জন্য টিকিট কাটলেও, পেমেন্ট গেটওয়ে বা ক্যাশ লেনদেন হয়েছে বিদেশে। ফলে এয়ারলাইন্সগুলো তাদের পাওনা বুঝে পেলেও, বাংলাদেশ সরকার বা দেশের ব্যাংকগুলো এই আয়ের কোনো হদিস পাচ্ছে না।
সাবেক আটাব নেতার বিতর্কিত অধ্যায়
অভিযুক্ত আসফিয়া জান্নাত সালেহ ট্রাভেল এজেন্টদের শীর্ষ সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ’ (আটাব)-এর সাবেক মহাসচিব। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ ছিল। চলতি বছরের আগস্ট মাসে সংগঠনের সভাপতি ও মহাসচিবের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় মন্ত্রণালয় আটাবের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
সায়মন ওভারসিজের এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর ট্রাভেল এজেন্সি সেক্টরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে গোটা সেক্টরের Reputation বা সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে এই অভিনব জালিয়াতির আরও গভীর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।