দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিরতি। আবারও অর্থনৈতিক সংস্কারের কঠিন পথে হাঁটল ইরান সরকার। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) থেকে দেশটিতে কার্যকর হয়েছে পেট্রলের নতুন বর্ধিত মূল্য। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনল তেহরান। তবে সরকারের এই ‘Economic Reform’ বা অর্থনৈতিক সংস্কারের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির বদলে ভিড় করেছে আতঙ্ক। কারণ, ঠিক পাঁচ বছর আগে এমনই এক সিদ্ধান্তে জ্বলে উঠেছিল গোটা ইরান, যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
মূল্যবৃদ্ধির নতুন সমীকরণ: তিন স্তরের ‘প্রাইসিং মডেল’
জনগণের ক্ষোভ প্রশমন ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবার কিছুটা ভিন্ন কৌশল নিয়েছে ইরান। প্রবর্তিত হয়েছে তিন স্তরের ‘Pricing Tier’। নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী: ১. ভর্তুকি মূল্য: মাসে প্রথম ৬০ লিটার পেট্রল পাওয়া যাবে আগের ভর্তুকি মূল্যেই, যা লিটারপ্রতি ১৫ হাজার রিয়াল। ২. দ্বিতীয় স্তর: পরবর্তী ১০০ লিটারের জন্য গ্রাহককে গুনতে হবে লিটারপ্রতি ৩০ হাজার রিয়াল। ৩. উন্মুক্ত বাজার দর: এর বেশি পেট্রল প্রয়োজন হলে, অর্থাৎ কোটার বাইরে কিনতে হলে লিটারপ্রতি খরচ হবে ৫০ হাজার রিয়াল।
জ্বালানিমন্ত্রী মহসেন পাকনেজাদ এই পদক্ষেপকে জ্বালানি ব্যবহারের প্রবণতা সংশোধনের একটি প্রাথমিক ধাপ বা ‘Correctional Measure’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
‘জন্মগত অধিকার’ বনাম রূঢ় অর্থনৈতিক বাস্তবতা
ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশে সস্তা পেট্রল পাওয়াকে নাগরিকরা অনেকটা তাদের ‘জন্মগত অধিকার’ বলে মনে করেন। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই অধিকারের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) তথ্য বলছে, ২০২২ সালে রাশিয়ার পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ‘Energy Subsidy’ বা জ্বালানি ভর্তুকি দিয়েছে ইরান, যার পরিমাণ প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ইরানের ‘Fiscal Deficit’ বা বাজেট ঘাটতিকে আকাশচুম্বী করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো দেশটিতে বার্ষিক ‘Inflation’ বা মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৪০ শতাংশের কোঠায়। দ্রুত অবমূল্যায়ন হচ্ছে ইরানি রিয়ালের। তার ওপর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) দেশটির অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে আর বিপুল ভর্তুকি টেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
২০১৯-এর ছায়া ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি
শনিবার নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে ‘High Alert’-এ রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। যদিও বড় কোনো সহিংসতার খবর এখনো পাওয়া যায়নি, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অনেকেই তাদের হতাশা প্রকাশ করছেন।
বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার মূল কারণ ২০১৯ সালের স্মৃতি। সেবার জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল নজিরবিহীন বিক্ষোভ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, সেই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত তিন শতাধিক মানুষ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান এবং দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে, সেখানে পেট্রলের এই দাম বৃদ্ধি ‘Domino Effect’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি জনরোষকে আবারও রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারে, যা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।