বিতরণ কোম্পানি ও বিইআরসির মতপার্থক্য
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে বিইআরসিতে একটি আবেদন জমা দেয়। তাদের দাবি, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্ধারিত পরিমাণে গ্যাসের বিল আদায় করা হলেও কিছু কিছু এলাকায় গ্রাহকরা এর চেয়ে অনেক বেশি গ্যাস ব্যবহার করে থাকেন। তিতাসের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয় যে এই অতিরিক্ত ব্যবহারকেই সিস্টেম লস হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যার ফলে তাদের আর্থিক লোকসান বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে তিতাস কর্তৃপক্ষ এক চুলার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৫৫ ঘনমিটার (৯৯০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৭৬.৬৫ ঘনমিটার এবং দুই চুলার ক্ষেত্রে ৬০ ঘনমিটার (১০৮০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৮৮.৪৪ ঘনমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। মূলত এই প্রস্তাবের পরই বিইআরসির সঙ্গে তিতাসের মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন শুরু হয়। একটি অভ্যন্তরীণ কমিটিও এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
বিতর্কের মূলে কী?
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, তারা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে অনেক এলাকার মিটারবিহীন গ্রাহকরা মাসে ১০০ থেকে ১২০ ঘনমিটার পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহার করছেন, অথচ বিল আদায় হচ্ছে মাত্র ৬০ ঘনমিটারের। তিনি বলেন, বাকি গ্যাস সিস্টেম লস হিসেবে গণ্য হওয়ায় লোকসান বাড়ছে, তাই তারা বিল বাড়ানোর আবেদন করেছেন।
বিইআরসি ও তিতাস সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে প্রায় ৪৪ লাখ আবাসিক গ্রাহক থাকলেও প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন মাত্র ৫ লাখের মতো গ্রাহক। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা গড়ে ৩০ ঘনমিটারের কম গ্যাস ব্যবহার করেন।
পূর্ববর্তী সমীক্ষা ও তথ্য
গ্যাস ব্যবহার নিয়ে এই বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৯ সালে বিইআরসি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) দ্বারা একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। ১৩টি জেলার ১ হাজার ৫৪ জন আবাসিক গ্রাহকের ওপর পরিচালিত সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকরা গড়ে ৫৭.৯ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন, আর মিটারবিহীন গ্রাহকরা গড়ে ৫৬ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। তবে তিতাস গ্যাস এই রিপোর্টের সঙ্গেও দ্বিমত পোষণ করে আসছে।
২০২২ সালের ৫ জুন সর্বশেষ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদেশের সময় বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকরা গড়ে এক চুলায় ৪০ এবং দুই চুলায় সর্বোচ্চ ৫০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। সেই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই পূর্বে নির্ধারিত এক চুলার ৭৩.৪১ ঘনমিটার এবং দুই চুলার ৭৭.৪১ ঘনমিটার কমিয়ে যথাক্রমে ৫৫ এবং ৬০ ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বুয়েটের সিদ্ধান্তের কারণ
বিতর্ক নিরসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিইআরসি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একটি সমীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও তিতাসের যৌথসভায় এই কাজটি বুয়েটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, বুয়েটের পরীক্ষার পরই তিতাসের আবেদন এবং গ্যাস ব্যবহার নিয়ে চলমান বিতর্কের অবসান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।