ফরিদপুরের আকাশে-বাতাসে তখন নগরবাউল জেমসের গিটারের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা। হাজার হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সঙ্গীতপ্রেমী জড়ো হয়েছিলেন ফরিদপুর জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে। কিন্তু সুরের সেই মায়াবী রাত মুহূর্তেই রূপ নিল রণক্ষেত্রে। বহিরাগতদের অতর্কিত হামলা এবং ইট-পাটকেল বৃষ্টির জেরে পণ্ড হয়ে গেল জেমসের বহুল প্রতিক্ষিত কনসার্ট। এই অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য সরাসরি পুলিশ প্রশাসনের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ ও ‘চরম গাফিলতি’কে দায়ী করেছে আয়োজক কমিটি। তাদের দাবি, সঠিক সময়ে ‘Security Protocol’ নিশ্চিত করলে এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
সুরের মঞ্চে রণক্ষেত্র: কী ঘটেছিল সেদিন?
ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের শেষ দিন ছিল শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর)। জেমসের গান শোনার জন্য যখন উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক রাজীব খান এক বিবৃতিতে জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল বহিরাগত অনুষ্ঠানস্থলে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায়। নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে তারা হিংস্র হয়ে ওঠে এবং চারদিক থেকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে।
এই হামলায় আয়োজক কমিটির সদস্যসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির খবর পেয়ে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে রাত ১০টার দিকে জননিরাপত্তার স্বার্থে অনুষ্ঠান বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে মঞ্চে ওঠার আগেই কনসার্ট না গেয়ে ঢাকা ফিরে যেতে হয় জেমস ও তার ব্যান্ড নগরবাউলকে।
পুলিশের ‘গাফিলতি’ নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ
আয়োজকদের অভিযোগ, বড় মাপের এই আয়োজনের জন্য আগেভাগেই জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আবেদন জানানো হয়েছিল। রাজীব খান বলেন, “শুরু থেকেই আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু স্কুলের ফটকে যখন বহিরাগতরা জড়ো হচ্ছিল, তখন পুলিশ যদি তাদের সরিয়ে দিত, তবে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না। পুলিশের এই ধরনের ‘Undeclared Inactivity’ বা নিষ্ক্রিয়তা আমাদের স্তম্ভিত করেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, জিলা স্কুলের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে এমন হামলা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। যারা এই ‘Mob Attack’-এর সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পাল্টা বক্তব্য পুলিশের: ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি’
আয়োজকদের আনা গাফিলতির অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। তার দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, “জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদাসীনতা ছিল না। পরিস্থিতি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তবে পুলিশ সেখানে ‘Crowd Control’ নিশ্চিত করতে সক্রিয় ছিল।”
নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন জেমস, অতঃপর ঢাকা যাত্রা
হামলার সময় জেমস জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে ছিলেন না। তিনি শহরের অন্য প্রান্তে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের রেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলেন এবং মঞ্চে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ায় এবং কনসার্ট বাতিলের ঘোষণা আসার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় তিনি ঢাকার উদ্দেশে ফরিদপুর ত্যাগ করেন।
হতাশায় নিমজ্জিত ফরিদপুরবাসী
১৮৫ বছরের ঐতিহ্যে ঘেরা একটি বিদ্যাপীঠের উৎসবে এমন হামলা স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ডিজিটাল যুগে যখন বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও পর্যটন বিকাশে বড় মাপের ‘Event Management’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তখন ফরিদপুরের এই ঘটনাটি ‘Security Breach’ বা নিরাপত্তা ত্রুটির এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকল। এই হামলার সঠিক তদন্ত ও বিচার না হলে ভবিষ্যতে বড় কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন ফরিদপুরে ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।