দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা নিরসনে এক বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৫৫ দিন থাইল্যান্ডের হেফাজতে থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন ১৮ জন কম্বোডিয়ান সৈন্য। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) থাই সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কম্বোডিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাসহ কম্বোডিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা এজেন্স কাম্পুচিয়া প্রেস (AKP) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
১৫৫ দিনের প্রতীক্ষার অবসান
গত জুলাই মাসে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় এই ১৮ জন কম্বোডিয়ান সৈন্যকে আটক করেছিল থাইল্যান্ড। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাতের পর গত শনিবার দুই দেশ নতুন করে একটি 'যুদ্ধবিরতি' (Ceasefire) চুক্তিতে সম্মত হয়। সেই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—যদি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রথম ৭২ ঘণ্টা সীমান্তে কোনো পক্ষ থেকে উস্কানি না আসে এবং শান্তি বজায় থাকে, তবেই আটক সৈন্যদের মুক্তি দেওয়া হবে।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় এবং শান্তি বজায় থাকায় সদিচ্ছা ও পারস্পরিক 'আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি'র (Confidence Building) অংশ হিসেবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়
সাম্প্রতিক এই সীমান্ত সংঘাত গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০ দিনব্যাপী চলা এই যুদ্ধে দুই দেশের অন্তত ৯৯ থেকে ১০১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। কেবল প্রাণহানিই নয়, এই যুদ্ধের ফলে সীমান্তের উভয় পাশের প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত (Displaced) হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন অস্থায়ী শিবিরে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও ভঙ্গুর শান্তি
উল্লেখ্য, এর আগে গত জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সরাসরি মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে এই মাসের শুরুর দিকে সেই 'ডিপ্লোমেটিক প্রটোকল' (Diplomatic Protocol) ভেঙে পুনরায় সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি শুরু হয়। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।
কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় এই ১৮ জন সৈন্য নিজ দেশের মাটিতে পা রাখেন। দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকার পর তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সদিচ্ছার নিদর্শন
বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত এশিয়ান অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ব্যাংককের পক্ষ থেকে এই 'গুডউইল জেসচার' (Goodwill Gesture) প্রমাণ করে যে, দুই দেশই এখন যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী। তবে এই শান্তি কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা নির্ভর করছে উভয় দেশের সামরিক নেতৃত্বের সংযম এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে স্বাগত জানিয়ে কম্বোডিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি কেবল সৈন্যদের মুক্তি নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি সংকেত।