• জীবনযাপন
  • শৈশবে স্মার্টফোনের বিষবাষ্প: ১৩ বছরের আগেই হাতে ফোন দিলে বাড়ছে বিষণ্নতা ও স্থূলতার ঝুঁকি

শৈশবে স্মার্টফোনের বিষবাষ্প: ১৩ বছরের আগেই হাতে ফোন দিলে বাড়ছে বিষণ্নতা ও স্থূলতার ঝুঁকি

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
শৈশবে স্মার্টফোনের বিষবাষ্প: ১৩ বছরের আগেই হাতে ফোন দিলে বাড়ছে বিষণ্নতা ও স্থূলতার ঝুঁকি

১২ বছর বয়সে ফোন পাওয়া শিশুদের ঘুমে ব্যাঘাতের ঝুঁকি ৬০ শতাংশ বেশি; গবেষকদের হুঁশিয়ারি ও বিশ্বজুড়ে কঠোর হচ্ছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ নীতিমালা।

স্মার্টফোন এখন আর কেবল বড়দের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবারাও সন্তানদের বায়না মেটাতে বা ব্যস্ত রাখতে খুব অল্প বয়সেই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন অত্যাধুনিক সব হ্যান্ডসেট। তবে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক তথ্য—১৩ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম ‘Risky’ বা বিপজ্জনক হতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি কেবল আসক্তি নয়, বরং শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, স্থূলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

গবেষণার তথ্যচিত্র: এক বছরের ব্যবধানেই আকাশ-পাতাল পার্থক্য

বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স’-এ (American Academy of Pediatrics) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে শৈশব ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণে গ্যাজেটের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফিলাডেলফিয়া চিলড্রেন’স হাসপাতালের প্রখ্যাত শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক র‍্যান বারজিলে যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি অঞ্চলের সাড়ে ১০ হাজার শিশুর ওপর এই দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা পরিচালনা করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অর্থাৎ ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন পেয়েছে, তাদের ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি অন্য শিশুদের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি। একইসঙ্গে তাদের মধ্যে ‘Obesity’ বা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ডিজিটাল আঘাত

গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, প্রায় ৩ হাজার ৪৮৬ জন কিশোর-কিশোরীকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, যারা ১২ বছর বয়সে ফোন ব্যবহার শুরু করেছে, তাদের মধ্যে ‘Mental Health’ বা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা যেমন—বিষণ্নতা (Depression) ও প্রবল উদ্বেগ (Anxiety) অনেক বেশি। তুলনায় যারা এই সময়েও ফোন থেকে দূরে ছিল, তাদের মানসিক গঠন অনেক বেশি সুসংহত। অধ্যাপক বারজিলে বলেন, “বয়ঃসন্ধির শুরুতে স্মার্টফোনের উপস্থিতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার শিশুদের মস্তিষ্ক ও হরমোন নিঃসরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা একদমই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।”

বিশ্বজুড়ে কঠোর হচ্ছে নীতিমালা: অস্ট্রেলিয়ার নজির

শিশুদের ওপর প্রযুক্তির এই ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় প্রথম দেশ হিসেবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি গত মাসের শুরুতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ সব ধরনের ‘Social Media’ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি আগামী ১০ ডিসেম্বর থেকে প্রযুক্তি জায়ান্টদের (Tech Giant) ওপর এই নির্দেশ কার্যকর করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশও ২০২৬ সাল থেকে একই ধরনের কঠোর ‘Policy’ গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা ও জর্জিয়ার মতো রাজ্যগুলোও পিছিয়ে নেই। সেখানে কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য মা-বাবার লিখিত অনুমতির বিধান রেখে আইন পাস করা হয়েছে। শিকাগোর সাবেক মেয়র রাহম ইমানুয়েল শিশুদের এই ডিজিটাল আসক্তিকে একটি ‘জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

টিকটক ও ‘টেক জায়ান্ট’দের মালিকানা বদল

এদিকে শিশুদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে চাপের মুখে থাকা জনপ্রিয় শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ‘টিকটক’ (TikTok) তাদের মার্কিন অংশীদারিত্ব বিক্রির একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই নতুন ব্যবস্থায় অ্যাপটির ৪৫ শতাংশ মালিকানা থাকবে ওরাকল, সিলভার লেইক ও আবুধাবিভিত্তিক কোম্পানি ‘এমজিএক্স’-এর (MGX) হাতে। বাকি ৫৫ শতাংশ শেয়ার থাকবে মূল কোম্পানি বাইটড্যান্সের বর্তমান বিনিয়োগকারী ও কোম্পানির নিজস্ব মালিকানায়। মালিকানা বদল হলেও শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করা এই ‘Tech Giant’-গুলোর জন্য আগামীতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেবল মা-বাবার সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক আইন সময়ের দাবি। অন্যথায়, স্মার্টফোনের এই উজ্জ্বল স্ক্রিন আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।

Tags: social media child psychology parenting tips mental health tech giant child health obesity risk smartphone risk research update digital addiction