বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুতকৃত পাঠ্যপুস্তকে বড় ধরনের পরিমার্জন ও সংশোধন নিয়ে এসেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)। নতুন এই সংস্করণে শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তার স্থলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত ‘জুলাই আন্দোলন’ সম্পর্কিত নতুন পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর পাঠ্যপুস্তকের নতুন Online Edition প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভাষণ বর্জন ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি সংশোধন
এনসিটিবি-র সংশোধিত পাঠ্যপুস্তকে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বিভিন্ন বইয়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকের (HSC) ইংরেজি বই থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা ‘Lesson’ বা পাঠটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বই থেকেও ৭ মার্চের ভাষণ সংবলিত গদ্যটি সরিয়ে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই বইটিতে ১২টি গদ্য থাকলেও ২০২৬ সালের নতুন সংস্করণে তা কমিয়ে ১১টি করা হয়েছে।
এছাড়া ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নামের উল্লেখ থাকলেও তা সীমিত আকারে এবং নির্মোহভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক অতিরঞ্জন কমিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরতেই এই সংস্কার আনা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের বীরত্বগাথা অন্তর্ভুক্ত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে শিক্ষা কারিকুলামে (Curriculum)। নতুন পাঠ্যবইয়ে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং আন্দোলনের মাধ্যমে আসা পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে নতুন অধ্যায় বা লেসন যুক্ত করা হয়েছে। মূলত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘জুলাই বিপ্লবের’ চেতনা ছড়িয়ে দিতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কেন এই সংস্কার? প্রশাসনের ব্যাখ্যা
এনসিটিবি সূত্র এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঠ্যপুস্তকে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অনেক ‘অতিরঞ্জিত তথ্য’ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ছিল। ৫ আগস্টের পর শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে গঠিত কমিটি এই বিষয়গুলো পর্যালোচনার পর সংশোধনীর প্রস্তাব দেয়। এরপর মাউশি থেকে এনসিটিবি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে পাঠ্যবই থেকে অতিরঞ্জিত তথ্য ও একপেশে ইতিহাস বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এনসিটিবি-র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আমাদের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনীতিকরণ বন্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের সামনে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা। পাঠ্যবইয়ের বোঝা কমিয়ে একে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে আমরা কাজ করছি। নতুন এই Revision-এর মাধ্যমে ছাত্ররা সাম্প্রতিক জনআকাঙ্ক্ষা ও বিপ্লবের ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে।”
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তনের প্রতিফলন
ইতোমধ্যেই ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকের এই পরিমার্জিত রূপটি NCTB-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ডিজিটাল ভার্সন বা অনলাইন সংস্করণটি পর্যালোচনার পর স্কুল-কলেজ পর্যায়ে মুদ্রিত কপি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। সরকারের এই পদক্ষেপকে দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশ ‘ইতিহাসের দায়মুক্তি’ হিসেবে দেখছেন, আবার অন্য একটি অংশ এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘Education System’ তৈরির লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।