তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এবার এক নতুন নাটকীয় মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে মনোযোগ দেওয়ার কড়া পরামর্শ দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি, ২০২৬) এক বিবৃতিতে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। একদিকে যখন জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদে পুরো ইরান জুড়ে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন দুই রাষ্ট্রপ্রধানের এই ‘Diplomatic Spat’ বা কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
কূটনৈতিক সংঘাত: খামেনি বনাম ট্রাম্প
সম্প্রতি ইরানের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, হোয়াইট হাউস ইরানের পরিস্থিতি ‘খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ’ (Monitoring) করছে। ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি তেহরান সরকার পূর্বের মতো বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বা হত্যাকাণ্ড শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে। ট্রাম্পের এই সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকির জবাবেই আজ খামেনি পালটা আক্রমণ করে বলেন, অন্যের দেশের দিকে না তাকিয়ে ট্রাম্পের উচিত তার নিজের প্রশাসনের সমস্যাগুলো সামাল দেওয়া।
উত্তাল ইরান: রাজপথে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু’ স্লোগান
গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে ইরানে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে মিছিল করছেন এবং ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন। অনেক জায়গায় সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতামূলক ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের গভীর ‘Public Frustration’ বা চরম অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট: অন্ধকারে ১২ ঘণ্টা
বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার এবার প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘নেটব্লকস’ (NetBlocks) নিশ্চিত করেছে যে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে ইরানজুড়ে সম্পূর্ণ ‘Internet Blackout’ জারি করা হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এবং বিশ্ববাসীর কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখতে দেশটিকে টানা ১২ ঘণ্টা ধরে কার্যত ‘Offline’ করে রাখা হয়েছে। এই ধরনের ডিজিটাল সেন্সরশিপ ইরানি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা হরণের একটি বড় কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো (Human Rights Organizations) ইরানে বিচারবহির্ভূত আটক ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আমেরিকার সাথে এর কূটনৈতিক সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও ‘Geopolitics’-এর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।