তেহরানের রাজপথে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যদি রক্তপাত অব্যাহত থাকে এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়, তবে ইরানকে ‘ভয়াবহ পরিণাম’ ভোগ করতে হবে বলে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি, ২০২৬) হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তেহরান যদি দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়, তবে ওয়াশিংটন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
১৩ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ইরানে গত ১৩ দিন ধরে চলমান এই বিক্ষোভে জনরোষ এখন তুঙ্গে। নরওয়েভিত্তিক এনজিও ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (Iran Human Rights)-এর তথ্যমতে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “ইরান বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন এমন সব শহর দখল করে নিচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি। আমরা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ (Monitoring) করছি।”
‘সামরিক পদক্ষেপের চেয়েও বড় আঘাত’
বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই—তারা যদি অতীতের মতো নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে, তবে আমেরিকা সরাসরি এতে জড়িয়ে পড়বে। এর অর্থ শুধু প্রথাগত সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং আমরা এমন জায়গায় এবং এমনভাবে আঘাত করব যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না। যদিও আমরা চাই না এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক।”
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প আরও বলেন, “সেখানে যা ঘটছে তা অবিশ্বাস্য। তারা তাদের জনগণের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেছে, আর এখন সেই জনগণই প্রতিশোধ নিতে রাজপথে নেমেছে।”
অর্থনৈতিক সংকট থেকে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর ডাক
ইরানের এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে। তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলনে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ইরান পরিচালনা করছে, তার অবসান ঘটিয়ে একটি উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারীরা। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই তৎকালীন পশ্চিমাপন্থি শাহ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
বৈশ্বিক চাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ইরানের এই দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোও। শুক্রবার ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির শীর্ষ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তারা তেহরানকে সর্বোচ্চ সংযম (Restraint) প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কড়া বার্তা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপ ইরানকে এক গভীর কূটনৈতিক সংকটের (Diplomatic Crisis) মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন যদি সত্যিই কোনো ‘বড় আঘাত’ হানে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) তা এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।