ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অবসানে এক বড় ধরণের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে হামাস। সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং গাজার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাসেম নাঈম জানিয়েছেন, গাজার সরকারি প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে পুরোপুরি সরে যেতে এবং যুদ্ধবিরতির (Ceasefire) দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করতে হামাস প্রস্তুত। তবে এমন কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে বাসেম নাঈম বলেন, হামাস গাজার বেসামরিক ও সরকারি প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি নিতে প্রস্তুত, যাতে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) অনুমোদনের পর যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাবটি এখন একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় (International Plan) পরিণত হয়েছে। হামাস এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইতিবাচক হলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। নাঈমের দাবি, ওয়াশিংটনের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়া এই পর্যায়ের সামরিক তৎপরতা চালানো ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়।
কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি, বাস্তবে রণক্ষেত্র
যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও গাজায় ইসরায়েলি ‘Military Operation’ বা সামরিক অভিযান বিন্দুমাত্র কমেনি। শনিবারও নেতানিয়াহু বাহিনীর হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গত বৃহস্পতিবারের হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। স্থানীয় সূত্রমতে, গাজার নুসেইরাত ও বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে (Refugee Camp) আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া রাফাহ, আল-মাওয়াসি এবং গাজা সিটির আসকুলা এলাকায় ভারি বোমাবর্ষণে শিশুসহ বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) দাবি, গাজা থেকে রকেট নিক্ষেপের চেষ্টার পাল্টা জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়: শীতে নবজাতকের মৃত্যু
গাজার মানবিক পরিস্থিতি (Humanitarian Crisis) এখন খাদের কিনারায়। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে হাড়কাঁপানো শীত—সব মিলিয়ে চরম অমানবিক জীবনযাপন করছে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ। ত্রাণ সরবরাহে ইসরায়েলি বাধার কারণে দেইর আল-বালাহ এলাকায় তীব্র ঠান্ডায় সাত দিনের এক নবজাতকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তাঁবু এবং ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের উপকরণ প্রবেশ করতে না দেওয়ায় ফিলিস্তিনিরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও খোলা আকাশের নিচে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা: জাতিসংঘের পরিসংখ্যান
জাতিসংঘের (UN) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ স্থাপনা বা ভবন আংশিক অথবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমাগত চাপ সত্ত্বেও উপত্যকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তা (Humanitarian Aid) নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।