• আন্তর্জাতিক
  • রণক্ষেত্র ইরান: নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ সদস্যের মৃত্যু, মসজিদে অগ্নিসংযোগ; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে চরম হুঁশিয়ারি তেহরানের

রণক্ষেত্র ইরান: নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ সদস্যের মৃত্যু, মসজিদে অগ্নিসংযোগ; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে চরম হুঁশিয়ারি তেহরানের

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
রণক্ষেত্র ইরান: নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ সদস্যের মৃত্যু, মসজিদে অগ্নিসংযোগ; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে চরম হুঁশিয়ারি তেহরানের

লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে উত্তাল পারস্য দেশ; বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানের মধ্যেই পাল্টা হামলার হুমকি দিলেন ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার।

তেহরান, ইরান: চরম অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইরান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে ভয়াবহ সহিংসতায়। গত কয়েক দিনের সংঘর্ষে দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১০৯ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এর মধ্যেই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কোনোভাবে তেহরানে হামলার দুঃসাহস দেখালে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

নিহতের সংখ্যা ছাড়াল একশো: রণক্ষেত্র ইসফাহান ও কেরমানশাহ

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইসফাহান প্রদেশে সহিংসতায় ৩০ জন পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশে আরও ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ‘Civil Unrest’ বা গণবিক্ষোভে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১০৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অভিহিত করলেও রাজপথে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও ক্ষোভ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

মসজিদে অগ্নিসংযোগ ও মানবিক সংস্থার কর্মীর মৃত্যু

সহিংসতার আঁচ পৌঁছেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মানবিক সহায়তা কেন্দ্রগুলোতেও। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার রাতে পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরের একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে একদল বিক্ষোভকারী। এই ঘটনাকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে প্রশাসন।

অন্যদিকে, ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (Red Crescent Society) জানিয়েছে, গোলেস্তান প্রদেশের রাজধানী গোরগানে তাদের একটি ত্রাণ ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় সংস্থাটির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নিহত হয়েছেন। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরের মধ্যে ইরানের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এবং সুসংগঠিত বিক্ষোভ।

তেহরানের হুঁশিয়ারি: টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল

ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতার মাঝেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার। তিনি সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ইরানকে অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টা করা হলে তার ফল হবে ভয়াবহ। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্র ইসরাইলের ওপর পাল্টা হামলা (Retaliation) চালানো হবে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ভেতরে ‘দাঙ্গা’ উসকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি দেশবাসীকে ‘দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের’ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আশ্বাস দিয়েছেন যে, সরকার জনগণের যৌক্তিক দাবি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

ক্ষোভের মূলে অর্থনৈতিক সংকট ও কঠোর আইন

ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার দাবি করলেও রাজপথের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান আল জাজিরাকে জানান, গত বৃহস্পতিবার ছিল ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দিন। তিনি বলেন, "ইরানের অধিকাংশ মানুষ বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও লাগামহীন Inflation নিয়ে অসন্তুষ্ট। তবে এই ক্ষোভ যে এভাবে সহিংস রূপ নেবে, তা অনেকেই ভাবেননি।"

এদিকে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল বিক্ষোভকারীদের ওপর আরও কঠোর হওয়ার সংকেত দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও সহিংসতায় সরাসরি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হতে পারে এবং বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড (Capital Punishment) পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এই সংকট নিরসনে তেহরান শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের আগামীর Geopolitics বা ভূ-রাজনীতি।

Tags: middle east inflation geopolitical tension tehran news iran protest us israel security forces mosque arson