সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুনের সেই নিথর দেহ আজও বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত। ২০১১ সালের সেই রক্তঝরা জানুয়ারি থেকে ২০২৫—সময় গড়িয়েছে প্রায় দেড় দশক। তবে সেই মর্মান্তিক স্মৃতি আজ এক নতুন সংকল্পে রূপ নিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। যে সীমান্তের কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়েছিল বোনের প্রাণ, সেই সীমান্ত রক্ষার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নবীন সৈনিক হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, আর কোনো বুক যেন খালি না হয় সীমান্তে।
বাইতুল ইজ্জতে শপথ: এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা
বুধবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত বিজিবির ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজ’ (BGTC&C)-এ এক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক মাসের কঠোর Military Training ও ডিসিপ্লিন শেষে আরফান হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন। কুচকাওয়াজ শেষে যখন দেশের পতাকাকে সাক্ষী রেখে শপথ পাঠ করছিলেন, তখন আরফানের চোখে ছিল দেশপ্রেম আর বোন হারানোর এক নীরব প্রতিজ্ঞার ছাপ।
‘বোনকে হারিয়েছি, আর কাউকে হারাতে দেব না’
প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন আরফান হোসেন। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারির সেই ভয়াল চিত্র। ফেলানীকে গুলি করে হত্যা এবং দীর্ঘ সময় তার লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার সেই অমানবিক দৃশ্য আজও আরফানকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আরফান বলেন, "আমার বোন যেভাবে সীমান্তে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে এবং যেভাবে তার লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলব না। আজ আমি বিজিবিতে যোগ দিয়ে শপথ নিয়েছি, যেন আর কোনো বোনকে সীমান্তে এভাবে গুলি করে হত্যা করা না হয়। কোনো মা-বাবা যেন তাদের সন্তানকে এমন অকালে না হারান, এটাই আমার জীবনের বড় অঙ্গীকার।"
পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ
একজন Professional সৈনিক হিসেবে আরফান হোসেন সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তার এবং তার পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন ছিল বিজিবিতে যোগ দেওয়া। চার মাসের কঠোর Training শেষে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে। আরফান দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, "সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হয়, তবুও আমি পিছিয়ে আসব না। বর্ডার সিকিউরিটি নিশ্চিত করাই এখন আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।"
ফেলানী হত্যাকাণ্ড: একটি রাষ্ট্রীয় ক্ষত ও স্মারক
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার রামখানা-অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) গুলিতে নিহত ফেলানী খাতুনের ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। এটি ছিল সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম উদাহরণ। দীর্ঘদিন পর হলেও সেই স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানাতে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন গুলশান কূটনৈতিক এলাকার একটি রাস্তার নামকরণ করেছে ‘ফেলানী এভিনিউ’। আরফানের বিজিবিতে যোগ দেওয়াকে অনেকে দেখছেন সেই ক্ষতে একটি পজিটিভ রেসপন্স হিসেবে, যেখানে স্বজন হারানোর শোকই হয়ে উঠেছে সীমান্ত রক্ষার প্রধান শক্তি।