হলিউডের রুপালি পর্দায় বহু তারকার উত্থান-পতন ঘটেছে, কিন্তু জোয়ি সালডানা যা করে দেখালেন, তা এক কথায় মহাকাব্যিক। বৈচিত্র্যময় চরিত্রে সাবলীল অভিনয় আর বক্স অফিসে অবিশ্বাস্য সাফল্যের মেলবন্ধনে তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবসাসফল অভিনয়শিল্পী। জেমস ক্যামেরনের মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’ (Avatar: Fire and Ash) ছবির সাম্প্রতিক সাফল্য সালদানাকে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো সমসাময়িক যেকোনো তারকার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বক্স অফিসের অপ্রতিরোধ্য রেকর্ড
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) হিন্দুস্তান টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জোয়ি সালডানা বিশ্বের তিনটি সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার অপরিহার্য অংশ। ২০০৯ সালের ‘অ্যাভাটার’, ২০১৯ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ এবং ২০২২ সালের ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’—এই তিনটি চলচ্চিত্রই বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।
তিনিই প্রথম নারী অভিনেত্রী যিনি চারটি ছবিতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি উপার্জনের রেকর্ড গড়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়্যার’। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের (MCU) ‘গ্যামোরা’ চরিত্র হোক কিংবা ‘স্টার ট্রেক’ ট্রিলজির ‘নিয়োটা উহুরা’—সালডানা যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর মোট আয় ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের শুরুতে ‘অ্যাভাটার ৩’-এর ১.২৩ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়ে তাঁকে স্কারলেট জোহানসন ও স্যামুয়েল এল জ্যাকসনের উপরে নিয়ে গেছে।
কৃতজ্ঞতা ও জাদুকরী পরিচালকদের প্রতি শ্রদ্ধা
এই ঐতিহাসিক অর্জনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় সালডানা বলেন, “আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এই অসাধারণ যাত্রার জন্য। এই সাফল্য আমার একার নয়, এটি সেই সব টিমের কৃতিত্ব যাদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি।” তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ‘অ্যাভাটার’ স্রষ্টা জেমস ক্যামেরন, ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ পরিচালক রুসো ব্রাদার্স এবং ‘গার্ডিয়ানস’ পরিচালক জেমস গানের প্রতি। সালডানার মতে, পরিচালকদের দিকনির্দেশনা এবং ‘Performance Capture’ প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার তাকে একজন ‘Global Star’ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
২০২৫: সালডানার স্বর্ণালি বছর
ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সালটি সালডানার সৃজনশীল ক্যারিয়ারের জন্যও শ্রেষ্ঠ সময়। চলতি বছরের মার্চে তিনি ‘এমিলিয়া পেরেজ’ (Emilia Pérez) ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার (Oscar) জয় করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রথম ডোমিনিকান-আমেরিকান অভিনেত্রী হিসেবে একাডেমি পুরস্কার জয়ের ইতিহাস গড়েন। একই মৌসুমে স্যাগ অ্যাওয়ার্ড, বাফটা এবং গোল্ডেন গ্লোব জিতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল বক্স অফিসের রানী নন, একজন জাত অভিনেত্রীও বটে।
পারফরম্যান্স ক্যাপচার ও নেইতিরির জাদুকরী রূপ
‘অ্যাভাটার’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে সালডানা নাভি যোদ্ধা ‘নেইতিরি’ চরিত্রে অভিনয় করেন। আট ফুট লম্বা এই নীল মানবীর চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে জেমস ক্যামেরন উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক ‘Performance Capture Technology’ ব্যবহৃত হয়েছে। সালডানা বলেন, “এই প্রযুক্তি আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে ডিজিটাল ক্যানভাসে জীবন্ত করে তোলে। জিমের (জেমস ক্যামেরন) কাছে অভিনয়ের সত্যতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
শৈশব থেকে বিশ্বজয়: এক অনুপ্রেরণার গল্প
নিউ জার্সির প্যাসাইকে জন্ম নেওয়া জোয়ি সালডানার জীবনসংগ্রামও বেশ নাটকীয়। ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে ফিরে যাওয়া এবং সেখানে নৃত্যের প্রশিক্ষণ নেওয়া তাঁর শিল্পীসত্তাকে ঋদ্ধ করেছে। ২০০৯ সাল ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের ‘Turning Point’, যখন তিনি একইসঙ্গে ‘স্টার ট্রেক’ এবং ‘অ্যাভাটার’-এর মতো দুটি বৈশ্বিক মেগা-প্রজেক্টে সুযোগ পান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বক্স অফিস আধিপত্য
জোয়ি সালডানার এই জয়যাত্রা এখনই থামছে না। ২০২৯ সালে মুক্তি পাবে ‘অ্যাভাটার ৪’ এবং ২০৩১ সালে আসবে ‘অ্যাভাটার ৫’। অর্থাৎ, বক্স অফিসে তাঁর যে রাজত্ব শুরু হয়েছে, তা আগামী এক দশক অটুট থাকবে বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। সালডানা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে যেন অন্য কোনো নারী অভিনেত্রী তাঁর এই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েন, যা হলিউডে নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সুসংহত করবে।