উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটের বহুমুখী চাপে টিকে থাকার লড়াই করছে, ঠিক সেই সময়ে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতার আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য “চরম আত্মঘাতী ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে পোশাক শিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
সংগঠন দুটির হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে যৌথ অবস্থানপত্র
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে পাঠানো এক যৌথ অবস্থানপত্রে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ স্পষ্ট করে জানায়, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সুতার আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, রফতানিযোগ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংগঠনগুলোর মতে, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পের টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি হলো— দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার আওতায় কাঁচামাল আমদানির সুবিধা।
এদিকে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা সরকারকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, “বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট— এই তিনটি চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শিল্প এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ঠিক এই সময়ে সুতা আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে তা হবে পোশাক শিল্পের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের স্পিনিং মিলগুলোর প্রধান ক্রেতা হয়েও পোশাক শিল্পের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় এমন সুপারিশ চূড়ান্ত করা অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রপতানি কমছেই, বাড়ছে ঝুঁকি
সেলিম রহমান জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই রফতানি হ্রাস পেয়েছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তার ভাষায়, “এই পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে শুধু পোশাক শিল্প নয়, পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
স্পিনিং খাত রক্ষার যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা বলেন, সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে স্পিনিং খাত রক্ষা করা যাবে—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ স্পিনিং ও নিটিং খাত কোনও বিচ্ছিন্ন শিল্প নয়— এগুলো তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, দেশে উৎপাদিত সুতার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রফতানিমুখী পোশাক কারখানায়। ফলে পোশাক শিল্পে ক্রয়াদেশ কমে গেলে স্পিনিং খাতও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে না।
দেশীয় সুতা কিনতে প্রস্তুত, তবে শর্ত রয়েছে
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা জানান, দেশীয় শিল্প টিকিয়ে রাখতে পোশাক উদ্যোক্তারা আমদানিকৃত সুতার তুলনায় সর্বোচ্চ ২০ সেন্ট পর্যন্ত বেশি দাম দিতে রাজি। কিন্তু বাস্তবে দেশীয় মিলগুলো বর্তমানে আমদানিকৃত সুতার তুলনায় ৩৫ থেকে ৬০ সেন্ট পর্যন্ত বেশি দামে সুতা বিক্রি করছে।
বর্তমানে যেখানে ভারতীয় উৎপাদকরা ৩০ কাউন্টের এক কেজি সুতা প্রায় ২ ডলার ৬০ সেন্টে সরবরাহ করছে, সেখানে দেশীয় মিলগুলো একই মানের সুতা বিক্রি করছে প্রায় ৩ ডলারে। এই দামের ব্যবধান আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করছে। গ্রে-কাপড় আমদানি বাড়ার আশঙ্কা
বিজিএমইএ-বিকেএমইএ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে দেশীয় সুতা ব্যবহারের পরিবর্তে গ্রে কাপড় আমদানি বাড়বে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তখন এমন দেশ থেকে কাপড় আমদানির নির্দেশ দেবে, যেখানে সুতা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী।
এর ফলে দেশীয় নিটিং কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাবে এবং বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি নিটিং কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। সবচেয়ে লাভবান হবে ভারত
সংগঠন দুটি দাবি করেছে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারত। কারণ ভারত একই সঙ্গে ১০-৩০ কাউন্ট সুতা ও গ্রে কাপড়ের প্রধান সরবরাহকারী। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ভারতীয় সরবরাহকারীদের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাড়বে এবং বাংলাদেশ উচ্চমূল্যে আমদানিতে বাধ্য হবে।
সার্টিফায়েড তুলা নিয়েও উদ্বেগ
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ সার্টিফায়েড তুলা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। সুতা নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যদি বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তাহলে বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার প্রত্যাহার করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘গত ছয় মাস ধরেই তৈরি পোশাক খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত রফতানিকে আরও সংকটে ফেলবে।’’
বিকল্প সমাধানের প্রস্তাব
সংগঠন দুটি সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে স্পিনিং ও পোশাক— উভয় খাতকে সহায়তার জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক সুদের হার ও সহজ ঋণপ্রবাহ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালাসম্মত নগদ সহায়তা উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নীতি সহায়তা।
সরকারের প্রতি আহ্বান
জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান ও বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
তাদের ভাষায়, “স্পিনিং খাত রক্ষার নামে যদি তৈরি পোশাক শিল্পই ঝুঁকিতে পড়ে, তবে তা কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। জাতীয় স্বার্থে সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এখন সময়ের দাবি।