ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহোৎসব টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (T20 World Cup) শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে এক চরম অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত ভারত সফর থেকে বিরত থাকে, তবে সেই পথে হেঁটে পাকিস্তানও টুর্নামেন্টটি বয়কট করতে পারে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'জিও নিউজ' (Geo News) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নিরাপত্তা শঙ্কা
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) যদি বিসিবির (BCB) দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে কোনো ‘নিউট্রাল ভেন্যু’তে (Neutral Venue) না নেয়, তবে পাকিস্তানও এই ইভেন্টে অংশগ্রহণ না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেখানে খেলতে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে আইসিসি-কে চিঠি দিয়েছিল। বিসিবির প্রস্তাব ছিল, তাদের ম্যাচগুলো যেন সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করা হয়।
ক্রিকেট ও কূটনীতির লড়াই: মোস্তাফিজ ও আইপিএল ইস্যু
ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক শীতলতার প্রভাব ক্রিকেটের গ্যালারি ছাড়িয়ে এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে, চলতি বছরের আইপিএলে (IPL) চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিসিসিআই-এর (BCCI) অদৃশ্য নির্দেশনায় টাইগার পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি বাংলাদেশ। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দেশে আইপিএল সম্প্রচার (Broadcast) নিষিদ্ধ করে এবং বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে না খেলার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) আইসিসি সদস্য দেশগুলোর এক ভার্চুয়াল সভায় বাংলাদেশের এই দাবি নাকচ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আইসিসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি’ (Credible Security Threat) ছাড়া সূচি পরিবর্তন করলে তা আইসিসি ইভেন্টগুলোর গরিমা ও স্বচ্ছতা নষ্ট করবে।
সিদ্ধান্তের দোলাচলে বিসিবি ও খেলোয়াড়রা
আইসিসি তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় এখন বাংলাদেশের সামনে দুটি বিকল্প খোলা রয়েছে। হয় তাদের দাবি প্রত্যাহার করে ভারতে খেলতে যেতে হবে, নতুবা আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আইসিসি বিকল্প কোনো দলকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে আলোচনার জন্য আইসিসির কাছে অতিরিক্ত সময় চেয়েছেন। আজই বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ খবর অনুযায়ী, দলের অধিকাংশ সিনিয়র ক্রিকেটার ও ‘কি-প্লেয়ার’ (Key Player) বৈশ্বিক এই আসরে অংশ নেওয়ার পক্ষেই মত দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও নতুন মেরুকরণ
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি সত্যিই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে বিশ্বকাপ বয়কট করে, তবে তা আইসিসি-র জন্য এক বিশাল ‘কমার্শিয়াল লস’ (Commercial Loss) এবং বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান ক্রিকেটীয় শক্তি একসাথে সরে দাঁড়ালে বিশ্বকাপের জৌলুস যেমন কমবে, তেমনি ক্রিকেট কূটনীতিতে ভারত একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এখন বিশ্ব ক্রিকেটের নজর ঢাকা ও ইসলামাবাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। ক্রিকেট মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই প্রশাসনিক টেবিলে শুরু হওয়া এই ‘পাওয়ার গেম’ (Power Game) শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়।