জাপানের উত্তর-মধ্যভাগে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ‘কাশিওয়াজাকি-করিওয়া’ (Kashiwazaki-Kariwa) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফের দেখা দিয়েছে প্রযুক্তিগত জটিলতা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) এর ৬ নম্বর রিঅ্যাক্টরটি চালুর প্রক্রিয়া শুরু হলেও মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (TEPCO) জানিয়েছে, একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখা হলেও রিঅ্যাক্টরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘স্থিতিশীল’ (Stable) অবস্থায় রয়েছে।
টেকনিক্যাল ত্রুটি ও নিরাপত্তা পদক্ষেপ
টিইপিসিও-এর দেওয়া তথ্যমতে, বুধবার যখন রিঅ্যাক্টরটি পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন প্রকৌশলীরা নিউট্রন শোষণকারী ‘Control Rod’ বের করার মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত ‘Nuclear Fission’ বা নিউক্লীয় বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কন্ট্রোল রড পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে ত্রুটি ধরা পড়ে।
পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জরুরি প্রয়োজনে এটি দ্রুত বন্ধ করার ক্ষেত্রে কন্ট্রোল রড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টিইপিসিও-এর মুখপাত্র তাকাশি কোবায়াশি এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করছি। তবে আশঙ্কার কিছু নেই, কারণ রিঅ্যাক্টরটি এখন স্থিতিশীল এবং কেন্দ্রের বাইরে কোনো ‘Radioactive’ বা তেজস্ক্রিয় প্রভাব পড়েনি। সমস্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি বন্ধই থাকবে।”
জাপানের জ্বালানি কৌশল ও ভূ-রাজনীতি
২০১১ সালের ভয়াবহ ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর জাপান নিরাপত্তার খাতিরে তাদের প্রায় সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছিল। তৎকালীন ভূমিকম্প ও সুনামির আঘাতে ফুকুশিমা প্ল্যান্টের তিনটি রিঅ্যাক্টরে ‘Meltdown’ ঘটেছিল, যা ছিল চেরনোবিলের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ‘Carbon Neutrality’ বা কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে জাপান পুনরায় পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে ‘Artificial Intelligence’ (AI) এবং বৃহৎ ‘Data Center’ গুলোর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প দেখছে না টোকিও। এই ৬ নম্বর রিঅ্যাক্টরটি পুরোপুরি সচল হলে প্রায় ১৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা টোকিওর প্রায় এক মিলিয়নেরও বেশি পরিবারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
স্থানীয় জনমত ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় জনমত। নিইগাতা (Niigata) প্রদেশে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এই কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিপক্ষে। তাদের দাবি, টোকিওর বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থানীয়দের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা অযৌক্তিক।
৭৩ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ইয়ুমিকো আবে তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টোকিওবাসীকে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে আমরা কেন তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্কে থাকব? এটি মেনে নেওয়া যায় না।” এছাড়া সাতটি নাগরিক সংগঠন ইতোমধ্যে জাপানের ‘Nuclear Regulation Authority’-এর কাছে ৪০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরিত একটি পিটিশন জমা দিয়েছে। তাদের মূল উদ্বেগ হলো, এই পাওয়ার প্ল্যান্টটি একটি সক্রিয় ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলের (Active Seismic Zone) ওপর অবস্থিত, যেখানে ২০০৭ সালেই শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
তদন্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
টিইপিসিও বর্তমানে ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্ল্যান্টটি পুনরায় চালু করা সরকারের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি বিষয়। তবে নিরাপত্তা বনাম প্রয়োজনীয়তার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও জনমতের মধ্যে কে জয়ী হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।