• জাতীয়
  • বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ: অর্থ যোগান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতিসহ যত চ্যালেঞ্জ

বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ: অর্থ যোগান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতিসহ যত চ্যালেঞ্জ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ: অর্থ যোগান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতিসহ যত চ্যালেঞ্জ

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছে জাতীয় বেতন কমিশন।

এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থের সংস্থান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রাজস্ব আয়। এছাড়া বেসরকারি খাতকেও এর প্রভাব সামলাতে হবে। সর্বোপরি এত বিপুল আকারে বেতন বৃদ্ধি হলে সেটা দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী চাপ ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলেছেন, পে কমিশনে যে সুপারিশ করা হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এ কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতে একটি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ব্যাংকগুলোকে আরেকটু নমনীয় হতে হবে। এজন্য সরকারকে আরও কৌশলী হয়ে সব সেক্টরকে সমন্বিত করে উদ্যোগ নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বেতন কাঠামোর মূল চ্যালেঞ্জের জায়গাটাই হলো কীভাবে এটা বাস্তবায়ন করবে—যে অর্থটা লাগবে সে অর্থের যোগান কোথা থেকে দেবে। আর এই অর্থের যোগান দিতে গেলেই সরকার নানান ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, আর রাজস্ব আয় বাড়াতে নানান দিকে চাপ পড়বে। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সব জায়গায় চাপ পড়বে।

তারা আরও বলছেন, একটা টাইমলাইন ঠিক করতে হবে যে কখন থেকে বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হবে। এই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যাতে সেবা খাতের সুবিধাগুলো জনগণ পেতে পারেন এবং অর্থনৈতিক দক্ষতাও বাড়ে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে যেন কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। মোট কথা হচ্ছে সরকারের ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে সামাল দেওয়া যায় সেটার দিকেও আমাদের সমান্তরালভাবে নজর দিতে হবে।

গত ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেন জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে কমিশন।

নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। এর ফলে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম ধাপে বেতন ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হচ্ছে। এর বাইরে এখনকার মতোই অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রযোজ্য হবে। তাতে ঢাকায় সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের একজন কর্মীর বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে। সরকারি চাকরিতে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব যাবে বেসরকারিতে এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান বলেন, বেতন কাঠামোটা অনেক দিন পরে করা হলো। দীর্ঘদিন একই জায়গায় বেতন স্কেল রাখাটাও আসলে ঠিক না। সবারই তো ক্রয়ক্ষমতার ব্যাপার আছে। সেটা আমাদেরকে ধারণার মধ্যে নিতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে বেতন কাঠামোতে যে সুপারিশ করা হয়েছে সেখানে বড় সমস্যা তৈরি হবে—এত টাকার যোগান কোথা থেকে আসবে সেটা সরকারকে চিন্তা করতে হবে।

তার মতে, সরকারের রাজস্বের অবস্থা খুবই নড়বড়ে এবং এর মধ্যে যদি অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ কোটি টাকা যোগান দিতে হয়, তাহলে চিন্তা করতে হবে যে এই যোগানকৃত অর্থ যদি আমাদের এই রাজস্ব থেকে দিতে হয়, তাহলে উন্নয়ন বাজেটকে বড় অংশে কাট করতে হবে। তারপরে বাংলাদেশ সরকারের ধারণক্ষমতার কথা চিন্তা করতে হবে—এটা এক নম্বর। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, যদি এই বড় মাত্রার স্কেল খুব তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন করা হয়, আমাদের এখনো মূল্যস্ফীতির চাপ অত্যধিক—এটা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে, কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই পুরোটা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকার বাজেট থেকে টাকা নিলেও মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে।

তিনি বলেন, পাবলিক সেক্টর-প্রাইভেট সেক্টর আলাদা বলে থাকি। কিন্তু পাবলিক সেক্টরের সঙ্গে প্রাইভেট সেক্টরের যারা কাজ করে তাদেরও কিন্তু একটা মজুরির যোগাযোগ আছে। সুতরাং পাবলিক সেক্টরে যদি মজুরি বাড়ে, প্রাইভেট সেক্টরকে রেসপন্ড করতে হয়। এটা ডাইরেক্টলি বলি আর ইনডাইরেক্টলি বলি—সে সম্পর্কটা থাকে। সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর কিন্তু একটা বড় মাত্রার চাপ আছে।

দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আপনি যদি বাংলাদেশে দেখেন—সার্ভেতে বলা হচ্ছে গত এক বছরে আমাদের প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। এখানে যদি আবার অতিরিক্ত বাড়তি মজুরির একটা প্রেসার আসে, প্রাইভেট সেক্টরের পক্ষে এটা নেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে আমি বলব যে একটা চ্যালেঞ্জিং সিচুয়েশনে দাঁড়াচ্ছে। আগামীতে যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, যে রাজনৈতিক দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক—তাদের জন্য এটা একটা বড় মাত্রার দুশ্চিন্তার কারণ হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার হচ্ছে খুবই দুর্বল সরকার। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত ছিল না এই কমিশন তৈরি করা। মূলত আমলাদের চাপে এই সরকার এই কাজটা করছে। যেহেতু দুর্বল সরকার ছিল, সবাই সরকারকে চাপ দিয়েছে, চেষ্টা করেছে। আর এই সরকার কী করছে? তারা কাগজ তৈরি করছে। এগুলো তো উনারা বাস্তবায়ন করবেন না। ওনারা এটার দায়টা পরের সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই পে কমিশন সুপারিশটা দিয়েছেন, সেটার মধ্যে যৌক্তিকতা আছে। এই কারণে যে গত পে কমিশন যখন বাস্তবায়িত হয়েছে, তার পর থেকে বেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে বাংলাদেশে। সেটাকে বিবেচনায় রেখে তারা যে প্রস্তাবটা করেছে সেটা আগের থেকে দ্বিগুণের মতো। এটা ঠিক যে আমাদের যারা সরকারি কর্মচারী, তাদের একটা শোভন জীবনধারণ করার মতো এটা প্রয়োজনও ছিল। যাতে তারা অন্য কোনো দিকে মনোযোগ না দিয়ে তাদের কাজে মনোযোগী হতে পারেন এবং একটা ভালো জীবনধারণ করতে পারেন। সুতরাং সেখানে তাদের জন্য যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা অযৌক্তিক কিছু না। কিন্তু এটার সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে।

‘এক নম্বর হলো: সরকার আগামী বাজেট থেকে কতটুকু নিতে পারবে এবং কীভাবে, কোন টাইমলাইনে এটাকে বাস্তবায়ন করা হবে—সেটা আগামী সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এটা নিশ্চয়ই একবারে করা যাবে না। সরকারের যে রাজস্ব আয়, সেটা থেকে একবারে করা সম্ভব হবে না। দুই নম্বর হলো: সরকারি কর্মচারীদের যখন বেতন বৃদ্ধি করা হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যে দায়বদ্ধতা, তাদের যে জবাবদিহিতা—সেগুলো যাতে নিশ্চিত করা হয়। সেটাও কিন্তু একটা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন এবং তাদের দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের যে প্রমোশন—সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে একটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং যেখানে জনগণ তাদের কাছ থেকে পরিসেবা চান—সেটা শিক্ষা হোক, স্বাস্থ্য হোক, সামাজিক সুরক্ষা হোক—সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’

‘তৃতীয় হচ্ছে, রাজস্ব খাতে একটা চাপ তৈরি হবে। এ কারণে ব্যয়ের একটা চাপ সৃষ্টি হবে—সেটা সরকারি কর্মচারীদের পারফরম্যান্স থেকেই ব্যয়টা উঠে আসতে হবে। যেমন এখানে তো রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীরাও রয়েছেন। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। তারপরে সরকারি বিভিন্ন যেসব সেবা ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়, সেখানে তারা কস্ট অব ডুইং বিজনেস যদি কমাতে পারেন, তখন কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালো হবে, বিনিয়োগও ভালো হবে। সেখান থেকে সরকার রাজস্ব আদায় বেশি করতে পারবেন’, যোগ করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে লিকেজ আছে, দুর্নীতি আছে—সেগুলো কিন্তু কমিয়ে নিয়ে এসে এবং নির্মূল করে এই টাকাটা নিতে হবে। সুতরাং এই যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ওপরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, সেটা আমাদের রাজস্ব আয় একই রকম রাখলে সরকারের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হবে না। তাহলে অন্যান্য খাত থেকে কাটতে হবে।

Tags: চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান মূল্যস্ফীতি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ অর্থ যোগান