আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। তবে এবারের নির্বাচনে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, জনচলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ বা পথসভা করা যাবে না। প্রচারণার এই মহোৎসব চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত, অর্থাৎ ভোটগ্রহণ শুরুর ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের 'Electioneering' কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
জনসাধারণের চলাচলে অগ্রাধিকার: সড়ক-মহাসড়কে সভা নয়
নির্বাচন কমিশনের ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’-এর ধারা ৬ (ঙ) অনুযায়ী, জনগণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো স্থান, সড়ক বা জনপথে কোনো ধরনের জনসভা বা সমাবেশ করা যাবে না। প্রার্থীর পক্ষে কোনো সমর্থকও এই নিয়মের বাইরে নন। মূলত শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এই 'Strict Policy' গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি: পোস্টার যুগের অবসান?
এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল ক্যাম্পেইনকে উৎসাহিত করা হলেও এনালগ প্রচারণায় আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। বিশেষ করে পলিথিন বা প্লাস্টিকের মতো 'Non-biodegradable' উপাদানের ব্যানার বা ফেস্টুন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডিজিটাল মিডিয়া ছাড়া অন্য সব প্রচার সামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যানারের আকার সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট এবং লিফলেট হতে হবে এ-ফোর সাইজের। এসব সামগ্রীতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো নেতার ছবি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা একটি 'Level Playing Field' তৈরির প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।
শোভাযাত্রা ও যান্ত্রিক মহড়ায় কঠোর বিধিনিষেধ
নির্বাচনী শোডাউনের নামে মোটরসাইকেল বা যান্ত্রিক যানবাহনের মহড়া এখন থেকে অতীত। ইসি স্পষ্ট জানিয়েছে, বাস, ট্রাক, নৌকা কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে কোনো মিছিল বা 'Showdown' করা যাবে না। এমনকি মশাল মিছিলের মতো কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা যাতায়াতের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারলেও সেখান থেকে লিফলেট বিতরণ বা প্রচারণার কোনো সুযোগ থাকবে না।
বিলবোর্ড ও প্রচার সামগ্রীর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ
নির্বাচনী প্রচারণায় বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। প্রতিটি সংসদীয় আসনের প্রতিটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে একটি করে এবং পুরো 'Constituency' এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। বিলবোর্ডের আয়তন হতে হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। এছাড়া কোনো সরকারি বা ব্যক্তিগত স্থাপনা, দেয়াল, গাছ কিংবা বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটিতে কোনো প্রচার সামগ্রী লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে ‘জিরো টলারেন্স’
প্রচারণার ভাষা ও শিষ্টাচার নিয়ে কঠোর অবস্থানে কমিশন। কোনো প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র হনন, কুৎসা রটনা কিংবা আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। এছাড়া লিঙ্গ, ধর্ম বা সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন যেকোনো উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদ, মন্দির বা গির্জার মতো ধর্মীয় উপাসনালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে রাখার কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সমন্বয় ও শান্তি রক্ষা
একই স্থানে একাধিক দলের কর্মসূচি থাকলে তা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে 'Coordinate' করতে হবে। সভার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে এবং একটি সভায় ৩টির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনের এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো নাগরিকের সম্পত্তির ক্ষতিসাধন বা সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসি।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং জনবান্ধব একটি নির্বাচন উপহার দেওয়াই এই নতুন বিধিমালার মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।