দেশের বাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দাম যেন এখন এক অপ্রতিরোধ্য ঘোড়া। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগাল ছাড়িয়ে এই ধাতুর দাম আবারও পৌঁছেছে এক অনন্য উচ্চতায়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েছে স্বর্ণ। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) থেকে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকায়।
তেজাবি স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা ও নতুন মূল্যতালিকা
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক সভায় এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী:
২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২,৬২,৪৪৪ টাকা।
২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২,৫০,৪৮৪ টাকা।
১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২,১৪,৭৩৪ টাকা।
সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৭৬,৫৯৩ টাকা।
উল্লেখ্য, বাজুস নির্ধারিত এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ক্রেতাকে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ VAT এবং বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ Making Charge (মজুরি) বাধ্যতামূলকভাবে পরিশোধ করতে হবে। তবে গহনার ডিজাইন ও মানভেদে মজুরির তারতম্য হতে পারে।
মাত্র এক দিনেই ৫ হাজার টাকার উল্লম্ফন
দেশের স্বর্ণের বাজারে এমন অস্থিরতা আগে কখনও দেখা যায়নি। এর মাত্র একদিন আগে অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারি স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সেদিন ভরিতে ১ হাজার ৫৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের ভরি করা হয়েছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা, যা কার্যকর হয়েছিল ২৬ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু সেই রেকর্ড টিকে থাকল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। নতুন করে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য স্বর্ণ কেনা এখন অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যানে স্বর্ণের বাজার: ২০২৫ ও ২০২৬-এর চিত্র
২০২৬ সালের শুরু থেকেই স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা তুঙ্গে। চলতি বছরের মাত্র ২৬ দিনে এ নিয়ে মোট ১৪ বার দাম সমন্বয় করা হলো। এর মধ্যে ১১ বারই বাড়ানো হয়েছে দাম, আর কমানো হয়েছে মাত্র ৩ বার।
পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) প্রভাব সরাসরি স্থানীয় স্বর্ণের বাজারে পড়ছে।
রুপার বাজারেও আগুনের আঁচ: রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি
স্বর্ণের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্লা দিচ্ছে রুপাও। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রুপার দামও পৌঁছেছে তার সর্বোচ্চ শিখরে। ভরিতে ৫২৫ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৭৫৭ টাকা।
রুপার অন্যান্য ক্যাটাগরির দাম:
২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি ৭,৪০৭ টাকা।
১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি ৬,৩৫৭ টাকা।
সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি ৪,৭৮২ টাকা।
চলতি বছর এ পর্যন্ত ১১ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ বারই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ সালে রুপার দাম ১৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল, যেখানে ১০ বারই দাম বেড়েছিল।
স্বর্ণ ও রুপার এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধি জুয়েলারি ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে স্বর্ণালংকার কেনার প্রবণতা কমে গিয়ে তা কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।