• আন্তর্জাতিক
  • বারুদস্তূপে মধ্যপ্রাচ্য: মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর আগমন, তেহরানের ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি

বারুদস্তূপে মধ্যপ্রাচ্য: মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর আগমন, তেহরানের ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
বারুদস্তূপে মধ্যপ্রাচ্য: মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর আগমন, তেহরানের ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি

পারস্য উপসাগরে নজিরবিহীন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি আমেরিকার; ইরান ও হিজবুল্লাহর পাল্টা যুদ্ধের হুমকির মুখে এক চরম উত্তেজনার সন্ধিক্ষণে বিশ্ব রাজনীতি।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও জলসীমায় যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে অবশেষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে পৌঁছেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ (USS Abraham Lincoln)। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (X) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই শক্তিশালী নৌবহরের মোতায়েন নিশ্চিত করেছে। ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি সংঘাতের দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বনাম সামরিক আধিপত্য

মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই নৌবহরটি মোতায়েন করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল নিয়মিত টহল নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দিয়ে একটি ‘বিশাল নৌবহর’ (Massive Fleet) পাঠানোর যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই মোতায়েন মূলত তারই অংশ। এর ফলে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তের ভুল পদক্ষেপকে একটি বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতে রূপ দিতে পারে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: ‘অনুতাপ উদ্রেককারী’ জবাব

মার্কিন এই সামরিক শক্তিবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র পিছু না হটার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসন (Aggression) মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, রণতরী মোতায়েন করে ইরানি জাতির প্রতিরক্ষা সংকল্প দমন করা যাবে না।

তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ওপর চালানো যেকোনো সামরিক আক্রমণকে তারা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ (Total War) হিসেবে বিবেচনা করবে এবং এর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত কঠোর ও ‘অনুতাপ উদ্রেককারী’। মূলত গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তৈরি হওয়া রেষারেষি এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের জের ধরে ওয়াশিংটন এই হার্ডলাইন নীতি গ্রহণ করেছে।

হিজবুল্লাহর সংহতি ও নতুন ফ্রন্টের হুমকি

লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম এক টেলিভিশন ভাষণে মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেন, “তেহরানের ওপর যেকোনো হামলা হিজবুল্লাহর ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য করা হবে।” হিজবুল্লাহর এই হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের ওপর হামলা শুরু হলে তা কেবল নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে এক বিধ্বংসী যুদ্ধ (Regional Conflict) ছড়িয়ে পড়বে। এই লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ কখনোই নিরপেক্ষ থাকবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলী অবস্থান

অস্থির এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবুধাবি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকূল সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না। উল্লেখ্য যে, আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত ‘আল ধাফরা’ (Al Dhafra) বিমান ঘাঁটিটি মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সেন্টার হওয়া সত্ত্বেও আমিরাতের এই ‘নো-ইউজ’ নীতি পেন্টাগনের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

পেন্টাগনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কেবল রণতরীই নয়, বরং ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত ‘স্টিলথ’ যুদ্ধবিমান (Stealth Jet Fighters) এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) মোতায়েন করছে। সপ্তাহান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই অঞ্চলে একটি বড় ধরনের মহড়া পরিচালনা করবে, যার মূল লক্ষ্য হবে প্রতিকূল পরিবেশে বিমান শক্তি মোতায়েন ও টেকসই সক্ষমতা প্রদর্শন করা।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর অবস্থানের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি ইরান ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে এক চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিশাল বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

Tags: regional security middle east tension us navy iran conflict military deployment uss abraham lincoln total war hezbollah threat centcom update uae diplomacy