• আন্তর্জাতিক
  • পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের হানা: বারাসাতে আক্রান্ত ৫, শতাধিক কোয়ারেন্টিনে; ভারতজুড়ে ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি

পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের হানা: বারাসাতে আক্রান্ত ৫, শতাধিক কোয়ারেন্টিনে; ভারতজুড়ে ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের হানা: বারাসাতে আক্রান্ত ৫, শতাধিক কোয়ারেন্টিনে; ভারতজুড়ে ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ক্লাস্টার চিহ্নিত হয়েছে কলকাতার উপকণ্ঠে, আইসিইউতে দুই নার্স; মৃত্যুহার ও সংক্রমণের ভয়াবহতায় কপালে চিন্তার ভাঁজ স্বাস্থ্য দপ্তরের।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস (Nipah Virus)। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যটিতে অন্তত পাঁচজনের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কলকাতার অদূরে অবস্থিত বারাসাত এলাকা। ভাইরাসের বিস্তার রোধে ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে কঠোর কোয়ারেন্টিনে (Quarantine) রাখা হয়েছে। কলকাতার অত্যন্ত নিকটবর্তী এলাকায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় জনমনে যেমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তেমনি নড়েচড়ে বসেছে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রশাসন।

সংক্রমণের ‘ক্লাস্টার’ ও আক্রান্তের বিবরণ

পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সংক্রমণের মূল উৎস বা ক্লাস্টার (Cluster) বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতাল। সেখানে এক গুরুতর অসুস্থ রোগীর সেবা করতে গিয়ে প্রথমে দুই নার্স জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আক্রান্ত পুরুষ নার্সের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও নারী নার্সের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। দুজনেই বর্তমানে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।

তদন্তে জানা গেছে, যে রোগীর সেবা করতে গিয়ে তারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তিনি পরীক্ষার আগেই মারা যান। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনিই ছিলেন এই সংক্রমণের ‘ইন্ডেক্স কেস’ (Index Case)। পরবর্তীতে ওই একই হাসপাতালের আরও তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী—একজন চিকিৎসক, একজন নার্স ও একজন সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরেও এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। বর্তমানে তাদের কলকাতার বেলেঘাটা আইডি (Infectious Diseases) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

নজরদারি ও দীর্ঘ ইনকিউবেশন পিরিয়ড

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করেছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১৮০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০ জনের রিপোর্ট আপাতত নেগেটিভ এসেছে। তবে চিকিৎসকদের দুশ্চিন্তা কাটছে না, কারণ নিপাহ ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড (Incubation Period) বা সুপ্তিকাল সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিন হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ের কথা মাথায় রেখে কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং কোয়ারেন্টিন শেষে তাদের পুনরায় পরীক্ষা করা হবে।

ভারতজুড়ে জাতীয় সতর্কতা জারি

পশ্চিমবঙ্গের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে তামিলনাডুসহ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোমে (Acute Encephalitis Syndrome) আক্রান্ত রোগীদের ওপর বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সফর বা কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস থাকলে দ্রুত স্ক্রিনিং নিশ্চিত করতে হবে।

নিপাহ ভাইরাসের ভয়াবহতা ও প্রতিকার

নিপাহ একটি জুনোটিক ভাইরাস (Zoonotic Virus), যা মূলত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এর প্রাকৃতিক বাহক হলো প্টেরোপাস প্রজাতির ফলভুক বাদুড়। আক্রান্ত প্রাণীর লালা বা মূত্র মিশ্রিত খাবার (যেমন খেজুরের রস বা বাদুড়ে খাওয়া ফল) গ্রহণ করলে বা আক্রান্ত মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে।

এই ভাইরাসের মৃত্যুহার (Mortality Rate) আতকে ওঠার মতো—প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা ও কাশির মতো লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত তা এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহে রূপ নেয়। এর ফলে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা কোমায় চলে যাওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে এই ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা অনুমোদিত টিকা (Vaccine) নেই; কেবল উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার মাধ্যমেই রোগীদের সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সতর্কতা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সময়ে জনসাধারণকে বিশেষ কিছু সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন: ১. বাদুড়ে খাওয়া কোনো ফল বা গাছ থেকে পড়া ফল স্পর্শ বা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ২. কাঁচা খেজুরের রস পান করা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। ৩. ফলমূল খাওয়ার আগে খোসা ছাড়িয়ে এবং ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। ৪. আক্রান্ত এলাকার ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে এবং নিয়মিত সাবান-জল দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে।

ভারতে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন নয়। ২০০১ সালে প্রথম শিলিগুড়িতে এই ভাইরাসের দেখা মিলেছিল। এরপর কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে একাধিকবার এর সংক্রমণ ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপাহ ভাইরাসকে অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণার তালিকায় রেখেছে, যাতে দ্রুত এর কার্যকর প্রতিকার বের করা সম্ভব হয়। আপাতত কঠোর আইসোলেশন (Isolation) এবং জনসচেতনতাই এই মরণঘাতী ভাইরাস মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।

Tags: medical emergency west bengal kolkata news health alert nipah virus virus outbreak encephalitis syndrome quarantine report who priority zoonotic disease