জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির মাসিক সভা আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা, লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সমরেশ শীল এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রেজাউল হক।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিভিল জজ উম্মে হানি সাদিয়া ও আবরার সালাম, সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. অরুপ পাল, জেল সুপার মো. নজরুল ইসলাম, মহিলা সংস্থার উপপরিচালক সুলতানা জোবেদা খানম, জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আহাম্মদ ফেরদাউস মানিক, লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিক উল্যা, জিপি অ্যাডভোকেট হারুন অর রশীদ বেপারী, ইপসার জেলা ব্যবস্থাপক আবেদ উল্যা, জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা এবং বেসরকারি সংস্থা জেমস-এর অ্যাডমিন অফিসার আক্তার নাহার শাহীনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা।
সভায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার দিলরুবা ইয়াছমিন জানান, গত ২৫ জানুয়ারি থেকে লক্ষ্মীপুরে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু হওয়ার পর নতুন আইনের আওতায় মাত্র তিন দিনে ১৯টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিষয়ে ২১ দিনের মধ্যে নোটিশ জারি, শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দু’জন আইনজীবী মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে কার্যকর মধ্যস্থতা বাস্তবায়নে আইনজীবীদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর বিচারিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে থানায় মামলা দায়ের না করেই এফিডেভিটে মামলা দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় বাদীরা আদালতে স্বীকার করেন যে, তারা থানায় মামলা দায়ের করেননি। এতে অনেক ক্ষেত্রে বাদী পক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সমরেশ শীল তাঁর বক্তব্যে বলেন, কথায় কথায় মামলা দায়েরের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কারো মাধ্যমে আর্জি লেখার প্রয়োজন নেই। বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে নির্ধারিত ফরমে কিংবা নিজেরাই অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। বিষয়টি ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, নইলে মামলা জট কমানো সম্ভব হবে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ প্রথমে সাধারণত নিকটস্থ থানা কিংবা পুলিশের কাছে আসে। যাদের ক্ষেত্রে পুলিশ আইনগতভাবে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে পারে, তা দেওয়া হয়। আর যাদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না- বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য লিগ্যাল এইড অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। লক্ষ্মীপুর জেলার প্রতিটি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও তদন্ত কেন্দ্রে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। তিনি লিগ্যাল এইড কার্যক্রমে পুলিশের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালুর ফলে লিগ্যাল এইড অফিসে কাজের চাপ বাড়বে। ২১ দিনের মধ্যে প্রতিটি অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একজন লিগ্যাল এইড অফিসার ও দু’জন মডারেটর দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। তিনি মডারেটরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এজলাস ব্যবস্থায় শুনানির প্রস্তাবও দেন।
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন বলেন, দেশের ২০টি জেলার সঙ্গে লক্ষ্মীপুরে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালু হওয়া বিচারপ্রার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি কল্যাণকর উদ্যোগ। আদালতে মামলা জট কমাতে সরকারের এই পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, সমাজে অনেক মানুষ আইন-কানুন না বুঝে কিংবা ভুল পরামর্শে মামলা দায়ের করে বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন যে, সেখানে তাদের ন্যায্যতা নেই। মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতার ফলে দীর্ঘদিন মামলা চালানোর আগেই একজন মানুষ বুঝতে পারবেন তার দাবির আইনগত ভিত্তি রয়েছে কি না। এতে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই অযথা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
তিনি আরও জানান, লিগ্যাল এইড অফিসে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করতে কোনো টাকা-পয়সা লাগবে না। সমন জারিসহ সব ব্যয় লিগ্যাল এইড অফিস বহন করবে। প্রয়োজনে আইনজীবীর মাধ্যমেও অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ সভায় উপস্থিত আইনজীবীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করেন।
মামলা জট কমাতে রাষ্ট্রীয় এই উদ্যোগ সফল করতে তিনি বেসরকারি সংস্থাসহ সকল সরকারি দপ্তরের সমন্বিত প্রচার-প্রচারণা ও সহযোগিতা কামনা করেন।