পাকিস্তানের ক্রিকেট মানেই অনিশ্চয়তা, রোমাঞ্চ আর খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আরও একবার সেই চিরচেনা রূপ দেখাল তারা। এক পর্যায়ে নিশ্চিত হারের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ৩ বল বাকি থাকতেই ৩ উইকেটে জিতে নিয়েছে পাকিস্তান। আর এই খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলার কারিগর অলরাউন্ডার ফাহিম আশরাফ।
শুরুতে ঝড়, মাঝপথে ‘ব্যাটিং কলাপ্স’
কলম্বোর মাঠে ১৪৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল রাজকীয়। সাইম আইয়ুব ও সাহিবজাদা ফারহানের ব্যাটে ভর করে ১১ ওভারেই স্কোরবোর্ডে ৯৮ রান তুলে ফেলে তারা। ৩১ বলে ৪৭ রান করে ফারহান যখন আউট হন, তখনও কেউ ভাবেনি ম্যাচটি এতটা কঠিন হবে। কিন্তু ১২তম ওভারে পল ফন মেকেরেনের স্পেলে চিত্রপট বদলে যায়। শূন্য রানে ফেরেন উসমান খান, এরপর বাবর আজম, মোহাম্মদ নেওয়াজ ও শাদাব খান দ্রুত সাজঘরে ফিরলে ১১৪ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় পাকিস্তান।
ফাহিম আশরাফের বিধ্বংসী ক্যামিও
১৭তম ওভারের প্রথম বলে শাদাব খান আউট হওয়ার পর পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে বিদায়ের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছিল। জয়ের জন্য শেষ ১২ বলে প্রয়োজন ছিল ২৯ রান। চাপের মুখে অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা দেখান ফাহিম আশরাফ। ম্যাচের ১৯তম ওভারে ওলন্দাজ বোলারদের ওপর রীতিমতো তান্ডব চালান তিনি। সেই এক ওভারেই ৩টি বিশাল ছক্কা ও ১টি চারে ২৪ রান তুলে সমীকরণ জলবৎ তরল করে দেন এই অলরাউন্ডার।
যদিও ইনিংসের এক পর্যায়ে ম্যাক্স ও’দাউড তার ক্যাচ মিস করে ‘লাইফ’ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন ফাহিম। শেষ পর্যন্ত ১১ বলে ২৯ রান করে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। অন্যপ্রান্তে ৫ রান করে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন শাহিন শাহ আফ্রিদি।
বিশ্বকাপ সমীকরণে কেন এই জয় ‘মাস্ট-উইন’ ছিল?
টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের শুরুতে একটি হার সাধারণত বিদায় নিশ্চিত করে না, কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা জটিলতায় পাকিস্তান আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলবে না। অর্থাৎ গ্রুপ পর্বে তাদের সামনে সুযোগ ছিল মাত্র তিনটি ম্যাচ। ডাচদের কাছে হারলে পরের দুই ম্যাচ জিতেও সুপার এইটে (Super Eight) যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত তাদের জন্য। ফাহিম আশরাফের এই ইনিংস মূলত পাকিস্তানকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছে।
উলোটপালোট পাকিস্তান
ক্রিকেট বোদ্ধারা প্রায়ই বলেন, ‘পাকিস্তান কেবল নিজেদের সাথেই হারে’। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তারই প্রতিচ্ছবি। জেতা ম্যাচকে কঠিন করে তোলা আর হারের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে আনা—এই দুই বৈপরীত্যেই যেন পাকিস্তানের সৌন্দর্য। ফাহিমের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ও ডেথ ওভারে তার স্ট্রাইক রেট (Strike Rate) আবারও প্রমাণ করল যে, লোয়ার মিডল অর্ডারে তিনি দলের কত বড় সম্পদ।
এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাল পাকিস্তান। তবে মিডল অর্ডারের এই হঠাৎ ধস (Middle Order Collapse) নিয়ে বাবর আজম ও টিম ম্যানেজমেন্টকে যে নতুন করে ভাবতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।