টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ডামাডোলের মাঝেই বিশ্ব ক্রিকেটের অন্দরমহলে বইছে উত্তাল হাওয়া। দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ আর বয়কট সংস্কৃতির ছায়া কাটিয়ে অবশেষে কি সুরাহার পথে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ক্রিকেট বিতর্ক? বিশ্বস্ত ক্রিকেট পোর্টাল ‘ক্রিকবাজ’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক এই সংকট নিরসনে এবার নতুন এক ‘কূটনৈতিক চাল’ চেলেছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। ভারতকে সাথে নিয়ে একটি ‘Tri-series’ বা ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজনের প্রস্তাবই এখন আইসিসির টেবিলে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের সূত্রপাত ও বিসিবি-পিসিবির ঐক্যজোট
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমানকে IPL থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে রেখে বিসিবির ভারত সফর ও বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে। সেই আগুনে ঘি ঢালে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB)। ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে পিসিবি সরাসরি বিসিবির পাশে দাঁড়ায়। একসময় যা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয় মান-অভিমান, তা মুহূর্তেই রূপ নেয় আইসিসির সঙ্গে দুই শক্তিশালী সদস্য দেশের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে।
লাহোরের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও পিএমও’র হস্তক্ষেপ
গত রবিবার লাহোরের ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে বিসিবি ও পিসিবির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন আইসিসির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ ছিল তুঙ্গে। ক্রিকবাজ জানিয়েছে, আলোচনার পুরো বিষয়টি এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের টেবিলে। ১৫ ফেব্রুয়ারির মেগা ম্যাচের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, আজ রাতের মধ্যেই কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে, যা ভক্তদের কলম্বো যাত্রার অনিশ্চয়তা দূর করবে।
আইসিসির অনড় অবস্থান ও আইনি মারপ্যাঁচ
এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) নিজেদের অবস্থানে অনড়। সংস্থাটির দাবি, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত ‘Member Participation Agreement’ (MPA) অনুযায়ী কোনো দেশই এমন দাবি তোলার আইনি ভিত্তি রাখে না। বিশেষ করে যেখানে ‘Hybrid Model’-এর অধীনে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার নিশ্চয়তা আগেই দেওয়া হয়েছিল। আইসিসি কর্মকর্তাদের মতে, ভারতের সঙ্গে কোনো দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিদেশীয় সিরিজের গ্যারান্টি দেওয়া তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়। কারণ, এর সাথে জড়িয়ে আছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ভারত সরকারের রাজনৈতিক সবুজ সংকেত।
ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রস্তাব: ক্রিকেটীয় নাকি বাণিজ্যিক চাল?
পিসিবি ও বিসিবির পক্ষ থেকে তোলা এই ত্রিদেশীয় সিরিজের দাবিকে অনেকে দেখছেন ‘Masterstroke’ হিসেবে। এর ফলে কেবল কূটনৈতিক বরফই গলবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে তৈরি হবে বিশাল ‘Market Value’। তবে আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নির্ধারিত দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নিয়ে যেখানে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, সেখানে এই ত্রিদেশীয় সিরিজ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।
পর্দার আড়ালের নায়ক ও চূড়ান্ত সমাধান
এই জট কাটাতে পর্দার আড়ালে কাজ করছেন আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা। লাহোরের বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন প্রভাবশালী বোর্ড পরিচালক মুবাশির উসমানি। দুবাই এবং মুম্বাইয়ের ক্রিকেট সার্কেলে গুঞ্জন, বড় কোনো ‘Financial Incentive’ অথবা ভবিষ্যৎ সিরিজের নিশ্চয়তা দিয়েই বিসিবি ও পিসিবিকে শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে আইসিসি।
শেষ পর্যন্ত ১৫ ফেব্রুয়ারির কলম্বোর মাঠে ভারত ও পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা মুখোমুখি হবেন কি না, তা এখন নির্ভর করছে লাহোর থেকে আসা চূড়ান্ত বার্তার ওপর। ক্রিকেট বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যেখানে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জয় হবে ২২ গজের লড়াইয়ের।