দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে একতরফা রাজনৈতিক আধিপত্যের পর এক সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ এখন তার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ‘জেন জি’ (Generation Z) বা জেনারেশন জেড অনুপ্রাণিত এক নির্বাচন। যেখানে রাজপথের আন্দোলনকারীদেরুণ্য এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ক্ষমতার লড়াই দৃশ্যমান হচ্ছে।
দীর্ঘ এক দশকের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে এক উন্মুক্ত নির্বাচনী ময়দান বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা গিয়েছিল বিরোধী দলগুলোর কোণঠাসা অবস্থা—হয় তারা ভোট বর্জন করেছিল, না হয় গণগ্রেফতারের মুখে মাঠে নামতেই পারেনি। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের এই নির্বাচনের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী জোটের মধ্যে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক (Competitive) নির্বাচন।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বিএনপির আত্মবিশ্বাস বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকলেও এবারের নির্বাচনে দলের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯২টিতেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্লবীতে এক বিশাল জনসভায় তারেক রহমান তার দলের জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। তিনি রয়টার্সকে জানান, জনগণের রায় নিয়ে তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন লাভের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত। বিএনপির মূল লক্ষ্য এখন রাষ্ট্র সংস্কার এবং বিধ্বস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা।
জামায়াত-এনসিপি জোট: তরুণদের নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে এক সময়ের নিষিদ্ধ দল জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এবং তাদের সাথে তরুণদের নতুন দল ন্যাশনাল সিভিক পার্টি বা এনসিপি-র (NCP) জোটবদ্ধ হওয়া। ৩০ বছরের কম বয়সী ‘জেন জি’ ভোটারদের দ্বারা পরিচালিত এনসিপি মূলত ৫ আগস্টের বিপ্লবের আদর্শকে ধারণ করে। শুরুতে এককভাবে লড়াইয়ের চিন্তা থাকলেও কৌশলগত কারণে তারা জামায়াতের সাথে জোট বেঁধেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত হয়তো এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, তবে তাদের নির্বাচনী ইতিহাসের সেরা ফলাফল করার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির কঠিন সমীকরণ এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক (Garments Exporter) দেশ হিসেবে কয়েক মাসের অস্থিরতায় শিল্প খাতে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন জরুরি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব এবং চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের (Investment) প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন সরকার কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের রায় সরাসরি বাংলাদেশের ‘Foreign Policy’ বা পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
নির্ধারক যখন ‘জেন জি’ ভোটার ঢাকার সেন্টার ফর Governance স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি জানান, বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তরুণ প্রজন্ম বা জেনারেশন জেড। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের পছন্দ-অপছন্দই নির্ধারণ করবে আগামীর ক্ষমতার চাবিকাঠি। রয়টার্সের তথ্যমতে, সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন (Undecided), যা নির্বাচনের ফলাফলকে যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। এক সময় যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল, সেখানে এখন বহুমুখী রাজনৈতিক বিকল্পের উপস্থিতি গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্ম কীভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করবে।