দুই বাংলার দর্শকদের কাছে চঞ্চল চৌধুরী এখন কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং শক্তিশালী অভিনয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো যেমন পর্দার গভীরতা স্পর্শ করে, বাস্তব জীবনেও তিনি তেমনই সোজাসাপ্টা ও স্পষ্টবাদী। সম্প্রতি কলকাতায় এক ঘরোয়া আড্ডায় যোগ দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্র শিল্পের এক রূঢ় সত্য তুলে ধরলেন এই মেগাস্টার। তাঁর মতে, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পেশাদার ইন্ডাস্ট্রি’ (Professional Industry) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।
পেশাদারিত্বের লড়াই: কলকাতা বনাম ঢাকা
কলকাতায় আয়োজিত সেই আলাপচারিতায় চঞ্চল চৌধুরী দুই বাংলার কাজের পরিবেশের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের ধরণ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল এবং ‘ছকবাঁধা’। চঞ্চল বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে সবকিছু খুব ছকবাঁধা এবং পেশাদার। একটি শুটিং কত দিনে শেষ হবে কিংবা সেই প্রজেক্টের বাজেট (Budget) কেমন হবে—সবকিছুই কাজ শুরুর আগে থেকে স্পষ্ট থাকে। আমাদের এখানে ঠিক এই জায়গাতেই বড় ধরণের ঘাটতি রয়ে গিয়েছে।”
তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, বাংলাদেশে পেশাদারিত্বের এই অভাবই ফিল্ম মেকারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে প্রি-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে শুটিং ফ্লোর পর্যন্ত যে ধরণের শৃঙ্খলার প্রয়োজন, তা এখনও গড়ে ওঠেনি।
বাজেটের অনিশ্চয়তা ও নির্মাতাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
চঞ্চল চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের সিনেমার অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো বাজেটের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকা। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, “আমি নিজে ১ কোটি থেকে শুরু করে ১০ কোটি টাকা বাজেটের ছবিতেও কাজ করেছি। কিন্তু এই যে বাজেটের কোনো স্থিরতা নেই, এটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।”
অনেক সময় দেখা যায়, একজন মেধাবী নির্মাতাকে একটি ভালো ছবির ফান্ড বা লগ্নি জোগাড় করতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবই ঢাকাই সিনেমাকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পূর্ণতা পেতে বাধা দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
গ্লোবাল অডিয়েন্স ও যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান
তবে কেবল সীমাবদ্ধতার কথাই বলেননি চঞ্চল, দেখিয়েছেন নতুন আশার আলোও। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের একটি বিশাল দর্শকগোষ্ঠী বা ‘গ্লোবাল অডিয়েন্স’ (Global Audience) রয়েছে। এই বিশাল বাজারকে ধরতে হলে দুই বাংলার মেধা ও কারিগরি শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। চঞ্চল চৌধুরীর কথায়, “সারা বিশ্বেই বাংলা ছবির বড় দর্শক রয়েছে। সেই দর্শকদের কথা মাথায় রেখে আমাদের এখন বড় পরিসরে এবং কোয়ালিটি সম্পন্ন কাজ করা উচিত।”
পর্দার সামনের ব্যস্ততা
শিল্পের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সোচ্চার হলেও নিজের অভিনয় জীবনে বিন্দুমাত্র বিরতি দেননি চঞ্চল। কলকাতার নামী পরিচালক ও নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসুর ‘শেকড়’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। গত বছর শান্তিনিকেতনের মনোরম পরিবেশে এই ছবির শুটিং শেষ হয়েছে। এছাড়াও, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে একটি নতুন ছবির কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন তিনি, যেখানে তাঁর সহশিল্পী হিসেবে দেখা যাবে জনপ্রিয় অভিনেত্রী পরীমণিকে।
চঞ্চল চৌধুরীর এই অকপট স্বীকারোক্তি দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সৃজনশীলতার পাশাপাশি ‘প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট’ যুক্ত হলেই ঢাকাই সিনেমা বিশ্ব দরবারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে—এমনটাই এখন চলচ্চিত্র প্রেমীদের প্রত্যাশা।