ঢাকা/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আর বেঁচে নেই। রোববার (১ মার্চ) সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম ও ফার্স খামেনির মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করে। এই মৃত্যুর সংবাদে কেবল ইরান নয়, গোটা বিশ্বের কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
তেহরানের স্বীকারোক্তি ও ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শনিবার গভীর রাতে এবং রোববার ভোরের দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর একটি ঝটিকা অভিযানে খামেনি নিহত হন বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে তেহরান এই তথ্য অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও, পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোববার সকালে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি (IRIB) জানায়, ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন’।
এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার ভোরেই খামেনিকে লক্ষ্য করে এই ‘Targeted Operation’ চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের পর থেকে এই পদটি দেশটির ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।
ট্রাম্পের সেই চাঞ্চল্যকর বার্তা: ‘দুষ্টু ব্যক্তির প্রস্থান’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘Truth Social’-এ এক দীর্ঘ বার্তার মাধ্যমে প্রথম এই সাফল্যের দাবি করেন। ট্রাম্প লিখেছেন, “খামেনি, ইতিহাসের অন্যতম দুষ্টু ব্যক্তি, এখন মৃত। এটি কেবল ইরানের নিপীড়িত জনগণের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সেই মহান আমেরিকানদের জন্য ন্যায়বিচার, যারা খামেনি ও তার রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, মার্কিন Intelligence ও অত্যাধুনিক Tracking System-এর নজর এড়াতে পারেননি খামেনি। ইসরায়েলের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের মতে, খামেনির মৃত্যু ইরানের জনগণের জন্য তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রকে উৎখাতের পর ইরানে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতার শাসন ব্যবস্থা শুরু হয়। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ছিলেন এই ব্যবস্থার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি কেবল ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং দেশটির সামরিক বাহিনীর Commander-in-Chief হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। তার মৃত্যুতে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশটির ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অনিশ্চয়তায় ইরান ও আইআরজিসি-র ভবিষ্যৎ খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের বিশেষ বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এবং পুলিশের বড় একটি অংশ বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে বলে দাবি করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দেশটির সামরিক বাহিনীর অনেকে এখন নিরাপত্তা (Immunity) প্রার্থনা করছেন এবং তারা আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক নন।
ট্রাম্প সরাসরি ইরানি দেশপ্রেমিক ও সামরিক বাহিনীকে একীভূত হয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন এবং তেহরান এই ‘Geopolitical’ ধাক্কা কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে দিতে পারে।
বর্তমানে ইরানজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং দেশটির উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা পরিষদ পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে জরুরি বৈঠকে বসেছে।