রাঙামাটির সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সাজানো ঝলমল করছে রসেভরা, সুমিষ্ট ‘হানিকুইন’ জাতের আনারস। বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় এই আনারস চাষ বদলে দিচ্ছে পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষকদের জীবনমান ও পাহাড়ের অর্থনীতি । বাম্পার ফলন ও ভালো দাম রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা ও সচ্ছলতা। তাই এখন শুধু আনারসের মৌসুম নয়, এটি আশার মৌসুমও। ‘পাহাড়ের কৃষকের স্বপ্নপূরণের নতুন হাতিয়ার। স্থানীয়রা আদর করে এই সোনালি আনারসকে বলছেন ‘পাহাড়ের হলুদ সোনা’।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে রাঙামাটিতে প্রায় ২,৫৫০ হেক্টর জমিতে আনারস চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জেলায় ২,৫৩৭ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে নানিয়ারচর উপজেলাকে বলা হয় ‘আনারসের রাজধানী’, যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে হানিকুইন জাতের আনারস আবাদ করা হয়েছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আনারসের মূল মৌসুম হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ও হরমোন ব্যবহারের ফলে এখন নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকেই বাজারে আগাম আনারস আসছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাঙামাটি শহরের বনরূপার সমতাঘাট, পুরাতন বাস স্টেশন ঘাট এবং নানিয়ারচর হাটে নৌকাভর্তি আনারস নিয়ে ভিড় করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। আকারভেদে প্রতিটি আনারস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে আনারস সংগ্রহ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। মৌসুমি ফল হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি, ফলে কৃষকরা নগদ অর্থ পাচ্ছেন এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী মো. জয়নাল জানান, “আমরা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি আনারস ২০ থেকে ২২ টাকা দরে কিনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি। এবার ফলন ভালো হওয়ায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি। তবে রাঙামাটিতে কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। যদি সংরক্ষণাগার স্থাপন করা যায়, তাহলে আরও ভালো দামে আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে।” নানিয়ারচর উপজেলার কৃষক পুতুল চাকমা বলেন, “ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় হানিকুইন আনারস চাষ অনেক বেশি লাভজনক। হেক্টরপ্রতি প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০টি আনারস উৎপাদিত হয়। খরচ বাদ দিয়ে এক একর জমি থেকে শীতকালেও প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। আগে আমরা নিজেদের প্রয়োজনের জন্য অল্প পরিমাণে চাষ করতাম, এখন বাণিজ্যিকভাবে বাগান করছি। এই আনারস আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সংরক্ষণাগার থাকলে কৃষকরা আরও উপকৃত হতেন। বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে অনেক সময় কম দামে আনারস বিক্রি করতে হয়, এতে লোকসান হয়।” একই উপজেলার আরেক কৃষক পরশি চাকমা জানান, “আগে জুম চাষ করে সংসার চালাতাম, কিন্তু তাতে পর্যাপ্ত আয় হতো না। তাই এবার ৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার আনারসের চারা রোপণ করেছি। ভালো ফলন হয়েছে এবং ভালো দামও পাচ্ছি। এতে সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে।”
রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “পাহাড়ের পতিত জমিগুলো আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো একটি কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার স্থাপন। সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প যেমন আনারস চিপস বা জুস কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।” তিনি আরও জানান, হানিকুইন জাতের আনারস দেশের অন্যতম মিষ্টি জাত। এর পাকা শাঁস উজ্জ্বল হলুদ রঙের এবং স্বাদে অনন্য। সাধারণত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আনারস সংগ্রহ শুরু হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকদের অতিরিক্ত লাভের সুযোগ সৃষ্টি করছে।