ফুটবল মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে বর্ণবাদ। আর এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে এবার নিজের দলের খেলোয়াড়কেই চরম হুঁশিয়ারি দিলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত কোচ জোসে মরিনিয়ো। বেনফিকার আর্জেন্টাইন তরুণ তুর্কি জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির বিরুদ্ধে রিয়াল মাদ্রিদ মহাতারকা ভিনিসিউস জুনিয়রকে বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মরিনিয়ো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে পর্তুগিজ ক্লাবটিতে প্রেস্তিয়ান্নির ক্যারিয়ারের এপিটাফ লিখে দেবেন তিনি নিজেই।
মরিনিয়োর রণমূর্তি ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ফুটবল বিশ্বে ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ (The Special One) হিসেবে পরিচিত মরিনিয়ো বরাবরই স্পষ্টভাষী। ২০ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন উইঙ্গার প্রেস্তিয়ান্নিকে ঘিরে চলমান তদন্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মরিনিয়ো তার কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, “যদি প্রমাণিত হয় যে আমার খেলোয়াড় (প্রেস্তিয়ান্নি) সেই সব নীতি লঙ্ঘন করেছে যা আমার এবং বেনফিকার আদর্শের পরিপন্থী, তবে আমার অধীনে তার ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ। সে যদি সত্যিই দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে আমি তাকে আর আগের চোখে দেখব না। আমাদের সম্পর্কের সেখানেই ইতি ঘটবে।” যেকোনো ধরনের বৈষম্যের ক্ষেত্রে তিনি যে ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতিতে বিশ্বাসী, তা এই বক্তব্যে আরও একবার স্পষ্ট হলো।
আইনি অধিকার বনাম নৈতিক অবস্থান মরিনিয়ো যেমন কঠোর, তেমনি আইনি মারপ্যাঁচেও দারুণ সচেতন। তদন্ত চলাকালীন জনমতের চাপে কোনো খেলোয়াড়কে আগাম দোষী সাব্যস্ত করার বিপক্ষে তিনি। ‘প্রেজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ (Presumption of Innocence) বা নির্দোষ হওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে মরিনিয়ো উয়েফার (UEFA) প্রাথমিক বিবৃতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমি আইনজীবী নই, তবে অজ্ঞও নই। নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার কি মানবাধিকার নয়? উয়েফা তাদের বিবৃতিতে খেলোয়াড়কে স্থগিত করার ক্ষেত্রে ‘যদি’ (If) শব্দটি ব্যবহার করেনি, যা একটি বিশাল তফাত গড়ে দেয়।” রায় আসার আগে কাউকে সামাজিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রবণতাকে তিনি বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেন।
রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বেনফিকা: কোনো পক্ষ নয় সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হিসেবে মরিনিয়োর প্রতি মাদ্রিদ ভক্তদের আলাদা টান রয়েছে। তবে বর্তমান ক্লাবের স্বার্থের প্রশ্নে তিনি আপসহীন। রিয়ালের ভারপ্রাপ্ত কোচ ও তার সাবেক শিষ্য আলভারো আরবেলোয়া এই বর্ণবাদ ইস্যুতে সরব থাকলেও মরিনিয়ো নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেন, “আমি আলভারোকে ভালোবাসি এবং সবসময় বাসব। কিন্তু এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সঠিক অবস্থানটি আমিই নিয়েছি, সে নয়। আমি রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি বা বেনফিকার লাল জার্সি—কোনোটির পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চাই না, আমি সত্যের পক্ষে।”
সান্তিয়াগো বের্নাব্যুতে ফেরার গুঞ্জন ও আনুগত্য ফুটবল পাড়ায় গুঞ্জন ছিল, রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচটিকে মরিনিয়ো নিজের পুরনো ক্লাবে ফেরার ‘অডিশন’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমন দাবিকে স্রেফ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন এই মাস্টারমাইন্ড। বেনফিকার প্রতি নিজের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আপনারা কি মনে করেন আমি যদি বেনফিকা ছেড়ে রিয়ালে যেতে চাইতাম, তবে এমন কড়া কথা বলতাম? আমি কি বোকা? আমি বেনফিকার সাথে আমার চুক্তিকে (Contract) সম্মান করি। ক্লাব চাইলে আমি এখনই কোনো শর্ত না বদলেই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নেব।”
মরিনিয়োর এই মন্তব্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং আধুনিক ফুটবলে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন ফুটবল বিশ্বের চোখ উয়েফার তদন্ত রিপোর্টের দিকে—যেখানে ঝুলে আছে তরুণ ফুটবলার প্রেস্তিয়ান্নির ভবিষ্যৎ।