পুলিশি পাহারায় থাকা শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে ফের গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাদের ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে নগরজুড়ে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসার সামনে ও পেছনে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ হতাহত না হলেও পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
পুলিশের ভাষ্য, চাঁদা না পেলেই আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য গুলি চালানো সাজ্জাদ বাহিনীর পুরোনো কৌশল। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন নির্মাণকাজ, ব্যবসা বা জমি লেনদেন শুরু হলেই চাঁদার দাবি আসে তাদের কাছ থেকে। বাহিনীতে অন্তত অর্ধশত শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভোরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ গুলির শব্দে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে দেখা যায় বাসার সামনে ও পেছনে গুলির চিহ্ন রয়েছে। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা চাঁদা না পেয়ে এ হামলা চালিয়েছে। প্রথমে ১০ কোটি, পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
চাঁদা না দেওয়ায় একাধিকবার ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে চারজন মুখোশধারী অস্ত্রধারীকে বাসার কাছে এসে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। একজনের হাতে দুটি পিস্তল, অন্যদের হাতে সাবমেশিনগান (এসএমজি), চায়নিজ রাইফেল ও শটগান ছিল। তারা একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে এসে কিছু দূরে গাড়ি রেখে হেঁটে বাসার সামনে গিয়ে গুলি চালিয়ে দ্রুত সরে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসা সাজ্জাদ বাহিনীর সক্রিয় কিলিং স্কোয়াডের নেতৃত্বে রয়েছেন রায়হান ও ইমন।
ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন এই দুইজনের হাতেই চলে আসে বলে দাবি পুলিশের। রায়হান একজন দুর্ধর্ষ শুটার। টার্গেট কিলিং করে দ্রুত পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে যাওয়াই তার কৌশল। রাউজান, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তার একাধিক গোপন আস্তানা রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় অন্তত আটটি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় রায়হানের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় ডজন মামলা হয়েছে।
রাউজানে যুবদল কর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলম হত্যা, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ‘ঢাকাইয়া আকবর’ খুন, গাজীপাড়ায় যুবদলকর্মী ইব্রাহিম হত্যা এবং বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুনের ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে। এছাড়া চান্দগাঁওয়ে ব্যবসায়ী তাহসীন হত্যা ও অক্সিজেন-হাটহাজারী এলাকায় দুইজনকে গুলি করে হত্যার মামলাতেও তিনি আসামি।
অন্যদিকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোবারক হোসেন প্রকাশ ইমন একই চক্রের সক্রিয় সদস্য। নগরজুড়ে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সশস্ত্র হামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। রায়হানের সঙ্গে যৌথভাবে বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করেন তিনি। বাহিনীতে অর্ধশতাধিক শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। নতুন নির্মাণকাজ, ব্যবসা বা জমি লেনদেন শুরু হলেই চাঁদার দাবি আসে তাদের পক্ষ থেকে।
পুলিশ বলছে, পলাতক এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনতে একাধিক টিম কাজ করছে। তবে পুলিশি পাহারার মধ্যেই সাবেক এমপির বাসায় গুলির ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়া জানান, সন্ত্রাসীরা একটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে করে এসে গাড়ি কিছুটা দূরে রেখে হেঁটে বাসার সামনে গিয়ে গুলি চালায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে পালিয়ে যায়। মুখোশধারী হওয়ায় হামলাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হলেও সাজ্জাদ আলীর সহযোগী মো. রায়হান ও বোরহানের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর), অতিরিক্ত দায়িত্বে সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানান, গুলির ঘটনায় মামলা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। সেই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গাড়িও উদ্ধার করা হয়েছে। এখন শুধু বাকি পলাতক রায়হান ও ইমনকে ধরার কাজ বাকি রয়েছে। মামলার সব আইনি প্রক্রিয়া চলমান, আশা করা হচ্ছে শিগগিরই ফলাফল পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা মূলত পলাতক অবস্থায় এবং পুলিশ একাধিক টিম দিয়ে অভিযান চালাচ্ছে। সকল প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে চলছে।