নেত্রকোনায় ১৩ বছরের এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে আইনের জালে ধরা দিলেন মামলার প্রধান আসামি গোলাম কিবরিয়া। সোমবার (২ মার্চ) দুপুরে নেত্রকোনার একটি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে বিচারক তা নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মামলা হলেও এতদিন প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পলাতক ছিলেন এই অভিযুক্ত।
ঘটনার নেপথ্যে: ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে নৃশংসতা মামলার বিবরণী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের জনৈক আব্দুস সাত্তারের ছেলে গোলাম কিবরিয়া প্রতিবেশী এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে দীর্ঘ সময় ধরে যৌন নিপীড়ন করে আসছিলেন। ওই কিশোরী প্রতিবেশী পারুল বেগমের বাড়িতে আরবি শিখতে যেত। সেখানেই সুযোগ বুঝে কিবরিয়া তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় মেয়েটি শুরুতে পরিবারের কাউকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারেনি। তবে শারীরিক পরিবর্তনের এক পর্যায়ে কিশোরীটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ধরা পড়ে যে, ১৩ বছর বয়সী ওই শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা (Pregnant)।
প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য ও পরিবারের উৎকণ্ঠা পেশায় অটোচালিত রিকশাচালক কিশোরীর দরিদ্র বাবা দিশেহারা হয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হলেও তাকে নিরাশ হতে হয়। অভিযোগ ওঠে, কিবরিয়া স্থানীয় প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যানের আত্মীয় হওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গ্রাম্য সালিশের নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়। কোনো বিচার না পেয়ে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বারহাট্টা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন ভুক্তভোগীর বাবা। পুলিশ মামলার সহযোগী আসামি পারুল বেগমকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতা কিবরিয়া ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে পরিবারটিকে নিয়মিত হুমকি (Threat) দিয়ে আসছিলেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা ও প্রশাসনের তৎপরতা দীর্ঘদিন আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় এবং নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারটির মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি নিয়ে গত রোববার (১ মার্চ) সময় টেলিভিশনে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই জেলা প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় ২৪ ঘণ্টার মাথায় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন কিবরিয়া।
এদিকে, গত ২২ ডিসেম্বর ওই কিশোরী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেছে। বর্তমানে অসুস্থ নবজাতক ও মাকে নিয়ে চরম অর্থকষ্টে দিন পার করছে পরিবারটি।
আইনি পদক্ষেপ ও ডিএনএ টেস্ট নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (SP) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, আসামি অত্যন্ত চতুরতার সাথে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করে আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশ তার পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে তারা কিবরিয়াকে হাজির করতে বাধ্য হয়। তিনি আরও বলেন, “এখন আমরা দ্রুততম সময়ে আসামির ডিএনএ পরীক্ষা (DNA Test) সম্পন্ন করব। নবজাতকের ডিএনএ-র সাথে আসামির প্রোফাইল মিলে গেলে আদালতে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
বর্তমানে ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার সন্তানের সুচিকিৎসার বিষয়ে নজর রাখছে স্থানীয় প্রশাসন। দরিদ্র এই পরিবারটি এখন কেবল দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।