শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর বাজার থেকে শেরপুর সদর অভিমুখী সড়কটি এখন আর কোনো উন্নয়নের পথ নয়, বরং এলাকাবাসীর কাছে এক জীবন্ত ‘মরণফাঁদ’। দীর্ঘ ২৬ মাস আগে শুরু হওয়া সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন কাজ আজও আলোর মুখ দেখেনি। সংস্কারের নামে সড়কের এক পাশে বিশালাকার গর্ত খুঁড়ে ঠিকাদার লাপাত্তা হওয়ায় প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
উন্নয়নের নামে ‘মরণফাঁদ’: ৩০ হাজার মানুষের আর্তনাদ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ে শ্রীবরদী উপজেলার পৌনে চার কিলোমিটার (৩,৭৫০ মিটার) সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। রাজশাহীর বোয়ালিয়ার ‘বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান (Contractor) এই কাজটি পায়। কার্যাদেশ পাওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটি সড়কের এক পাশে গভীর গর্ত খুঁড়ে প্রশস্ত করার কাজ শুরু করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এর পরেই থমকে যায় সব। বর্তমানে সড়কের এই অংশটি চলাচলের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শ্রীবরদীসহ চারটি উপজেলার মানুষ যাতায়াত করেন। দিনের বেলা ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চললেও, রাতের আঁধারে এটি এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। সরু রাস্তার এক পাশে গভীর খাদ থাকায় দুটি গাড়ি পাশাপাশি অতিক্রম করার কোনো উপায় নেই। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কাগজে-কলমে ‘বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন’ কাজটি পেলেও মাঠ পর্যায়ে ‘Project Management’ ও তদারকি করছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের সাথে সাথেই ওই নেতা আত্মগোপনে চলে যান। এর পরেই মূলত প্রকল্প এলাকা থেকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উধাও হয়ে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্য ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানো এবং দুর্নীতির কারণেই আজ এই বেহাল দশা।
ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাস ও দুর্ঘটনার শঙ্কা
হেরুয়া এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন ক্ষোভের সাথে জানান, “আগের সরু রাস্তাই আমাদের জন্য ভালো ছিল। অন্তত স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারতাম। গত আড়াই বছর ধরে রাস্তার এক পাশ ড্রেনের মতো খুঁড়ে রাখা হয়েছে। বৃষ্টির দিনে এই গর্ত যেন এক মৃত্যুকূপ।”
স্থানীয় অটোরিকশা চালক মফিজুল ইসলাম বলেন, “ফুটপাত না থাকায় আমাদের চলাচলে খুব কষ্ট হয়। প্রায়ই রাতের বেলা গাড়ি উল্টে যায়। কোনো গাড়ি এখানে সামান্য নিয়ন্ত্রণ হারালেই সোজা খাদে পড়বে। আমাদের দেখার কি কেউ নেই?”
চুক্তি বাতিল ও নতুন টেন্ডারের আশ্বাস
বর্তমানে পলাতক রাজনৈতিক নেতা বা মূল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি। তবে জনদুর্ভোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন শ্রীবরদী উপজেলা প্রকৌশলী মশিউর রহমান। তিনি জানান, জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি (Contract) বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রকৌশলী মশিউর রহমান আরও বলেন, “আমরা দ্রুত নতুন করে দরপত্র (Tender) আহ্বানের মাধ্যমে কাজটি পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেই নতুন করে কাজ শুরু হবে যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হয়।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি শুধু চুক্তি বাতিল নয়, বরং জনভোগান্তি সৃষ্টি ও সরকারি অর্থের অপচয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কার না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন চার উপজেলার মানুষ।