ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুললেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। তার মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট বা সমন্বিত ‘এক্সিট প্ল্যান’ (Exit Strategy) নেই। মঙ্গলবার (১১ মার্চ) ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের ‘মিলিটারি অ্যাগ্রেশন’ বা সামরিক আগ্রাসনের ১১তম দিনে এক বিবৃতিতে তিনি এই শঙ্কার কথা জানান।
সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের শঙ্কা জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের বেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রাকে জার্মানি সমর্থন করলেও, যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের অস্পষ্টতা। ম্যার্ৎসের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এই সংঘাত কীভাবে দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে শেষ করা হবে। এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো পরিষ্কার ‘কৌশলগত সমন্বয়’ (Strategic Coordination) দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সমাপ্তির পরিকল্পনা ছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ‘এস্কেলেশন’ (Escalation) বা উত্তেজনাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ইরানের ওপর হামলার পাল্টা হিসেবে তেহরান যখন ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর পাল্টা আঘাত হানছে, তখন বিশ্বজুড়ে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ‘এনার্জি মার্কেট’ বা জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার ফলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিতে পারে। ম্যার্ৎস সতর্ক করে বলেন, এই অস্থিরতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
ইউরোপীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিলেও ম্যার্ৎস মনে করেন, কূটনৈতিক পথ ছাড়া কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা ইউরোপের দোরগোড়ায় অস্থিতিশীলতা বয়ে আনবে।” জার্মান চ্যান্সেলরের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন বাইডেন প্রশাসন এবং নেতানিয়াহু সরকার ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে, কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে কোনো রূপরেখা এখনও বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করেনি।
কূটনৈতিক শূন্যতা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) প্রেক্ষাপটে জার্মানির এই অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে মিত্র দেশগুলোর সামরিক পদক্ষেপের প্রতি মৌন সমর্থন, অন্যদিকে যুদ্ধের ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা—ম্যার্ৎসের এই দ্বিবিধ অবস্থান মূলত একটি ‘গ্লোবাল ফায়ারফাইট’ এড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। তেহরান যখন আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে প্রতিরোধের দেওয়াল তৈরি করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ‘জয়েন্ট ভিশন’ বা যৌথ পরিকল্পনার অভাব বিশ্বনেতাদের ভাবিয়ে তুলছে।
এখন দেখার বিষয়, জার্মানির এই সতর্কবার্তার পর ওয়াশিংটন বা তেল আবিব তাদের সামরিক কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, নাকি একটি ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ দিকেই ধাবিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য।