মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এক নাটকীয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিল ওয়াশিংটন। রাশিয়ার ওপর কঠোর ‘Sanctions’ বা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা নমনীয় হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (US Treasury Department) সাগরে আটকে থাকা রুশ তেল কেনার জন্য বিভিন্ন দেশকে ৩০ দিনের একটি বিশেষ ‘Window’ বা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তবে এই নমনীয়তা নিঃশর্ত নয়; বরং নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে জাহাজীকরণ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন করার মতো কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েই বিশ্ববাজারের ‘Volatility’ বা অস্থিরতা কমাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
কৌশলগত নমনীয়তা ও ৩০ দিনের বিশেষ ‘লাইসেন্স’ মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন যে, সমুদ্রের মাঝপথে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনার জন্য বিভিন্ন দেশকে ৩০ দিনের বিশেষ লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অস্থিতিশীল বিশ্ব ‘Global Energy Market’ কে স্থিতিশীল করতেই এই পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ—ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘X’-এ এই ঘোষণা দেন বেসেন্ট। তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার সরকার বড় ধরনের কোনো আর্থিক সুবিধা পাবে না, বরং এটি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার একটি ‘Tactical Move’ বা কৌশলগত চাল।
ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের রেকর্ড ও ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নতুন লাইসেন্স অনুযায়ী, গত ১২ মার্চের মধ্যে জাহাজে বোঝাই করা রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ এবং বিক্রির এই অনুমতি আগামী ১১ এপ্রিল ওয়াশিংটন সময় মধ্যরাত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আগে গত ৫ মার্চ, ভারতের জন্য একইভাবে ৩০ দিনের একটি বিশেষ ‘Waiver’ বা ছাড় দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যার ফলে এশীয় জলসীমায় ভাসমান কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল রুশ তেল কেনার সুযোগ পায় নয়াদিল্লি।
রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার বিশাল কর্মপরিকল্পনা কেবল রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব ‘Strategic Petroleum Reserve’ (কৌশলগত মজুত) থেকেও বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, তারা নিজস্ব মজুত থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়বে। ৩২ জাতির আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) বিশ্ববাজারে মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার যে যৌথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মূলত তারই একটি প্রধান অংশ।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যে মার্কিন ‘International Development Finance Corporation’ (DFC)-কে পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘Risk Insurance’ বা রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা এবং আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী (US Navy) ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা এখন চরমে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘Strait of Hormuz’ বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, হামলা বন্ধ না হলে তারা পারস্য উপসাগরের সমস্ত তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কেবল রুশ তেল বা কৌশলগত মজুত দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ওয়াশিংটনের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি মূলত বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি সম্ভাব্য ‘Energy Shock’ বা জ্বালানি বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।