দেশের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই পদক্ষেপকে ‘জনগণের ভোটাধিকার হরণের নতুন কৌশল’ এবং আরেকটি ‘Election Engineering’-এর পাঁয়তারা বলে কঠোর সমালোচনা করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের নেতারা মনে করছেন, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে মূলত নির্বাচনকে দীর্ঘায়িত করে এক ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তোলা হয়।
নির্বাচন এড়িয়ে চলার কৌশল?
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের প্রতিবাদকে তোয়াক্কা না করে প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটছে। এটি স্পষ্টতই নির্বাচনকে এড়িয়ে চলার একটি অপকৌশল। প্রশাসক নিয়োগের আড়ালে নতুন কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যৌক্তিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।” তিনি অনতিবিলম্বে এই নিয়োগ আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানান।
প্রশাসনে ‘দলীয়করণ’ ও পেশাদারিত্বের সংকট
বর্তমানে প্রশাসনের স্তরে স্তরে যে রদবদল চলছে, সেটিকে ‘ঢালাও দলীয়করণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি অভিযোগ করেন, প্রজাতন্ত্রের যেসব কর্মচারী দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছেন, তাদের বেছে বেছে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে প্রশাসনের Professionalism বা পেশাদারিত্ব মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মেধার মূল্যায়ন না করে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন করা রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
‘মিষ্টির ভেতরে ওষুধ’: সংস্কার নিয়ে রূপকধর্মী সমালোচনা
রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের ‘সিলেক্টিভ’ বা বেছে বেছে নীতি গ্রহণের কড়া সমালোচনা করেন এই জামায়াত নেতা। একটি রূপক গল্পের আশ্রয় নিয়ে তিনি বলেন, “এক শিশুকে তার মা মিষ্টির ভেতরে তেতো ওষুধ ভরে দিয়েছিলেন। শিশুটি মিষ্টি খেয়ে বিচি ভেবে ওষুধটি ফেলে দিল। ঠিক তেমনি, সরকার সংস্কারের নামে ওপরের চাকচিক্য বা মিষ্টি গ্রহণ করছে, কিন্তু আসল ‘ওষুধ’ বা মূল সংস্কারের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে আংশিক সংস্কার দিয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জঞ্জাল দূর করা সম্ভব নয়।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জুলাই সনদ’ বা আন্দোলনের সময়কার জনগণের দাবিগুলো এখন জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও ‘Check and Balance’
সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বা Check and Balance নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন জোটের নেতারা। ডেপুটি স্পিকার পদের প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “বিএনপি আমাদের কাছে ডেপুটি স্পিকারের নাম প্রস্তাব করতে বলেছিল। আমরা চাই তারা উদার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসুক। জুলাই সনদে স্পষ্ট বলা আছে, সংসদীয় কার্যক্রমে ভারসাম্য রক্ষায় ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল থেকে হওয়া উচিত।”
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের সরব উপস্থিতি ছিল। উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিশের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামুল বশির, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ড. মুস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ এবি পার্টির শীর্ষ নেতারা। নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে রাজপথেই তার মোকাবিলা করা হবে।