রাজধানী যেন ধীরে ধীরে তার ব্যস্ততার রূপ বদলে নিচ্ছে। একদিকে ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ফাঁকা হতে শুরু করেছে ঢাকার সড়ক, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জমে উঠেছে শপিংমল, মার্কেট আর ফুটপাত। এই দ্বৈত চিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠছে উৎসবের আবহ- যেখানে আছে আনন্দ, ব্যস্ততা, ভিড় আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সুখ খোঁজার চেষ্টা।
ঈদের একেবারে দোরগোড়ায় এসে রাজধানীর কেনাকাটার চিত্র নিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে বেচাকেনা এখন পুরোদমে চলছে। বিশেষ করে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স এবং যমুনা ফিউচার পার্কে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন নগরবাসী।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, শপিংমলগুলোর প্রবেশমুখ থেকেই শুরু হচ্ছে দীর্ঘ সারি। নিরাপত্তা তল্লাশি পার হতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বেশ কিছু সময়। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে রঙিন পোশাকের সমারোহ- নতুন নকশা, বৈচিত্র্যময় রঙ আর আকর্ষণীয় ডিসপ্লে যেন ক্রেতাদের টানছে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে।
মার্কেটের প্রতিটি তলায় একই চিত্র- উপচে পড়া ভিড়, ব্যস্ত বিক্রয়কর্মী, আর পছন্দের পোশাক হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ক্রেতারা।
ট্রায়াল রুমের সামনে লম্বা লাইন, বিলিং কাউন্টারে অপেক্ষারত মানুষের সারি, সব মিলিয়ে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেকেই সময় বাঁচাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেনাকাটা সেরে ফেলছেন, আবার কেউ কেউ ধৈর্য ধরে খুঁজছেন পছন্দের পণ্য। একাধিক বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রমজানের শুরুতে কেনাকাটার চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও শেষ সপ্তাহে এসে তা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে অফিস শেষ করে সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের ভিড় হঠাৎ করেই বেড়ে যায়।
মো. সাখাওয়াত নামে একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, “সারাদিন মোটামুটি থাকে, কিন্তু ইফতারের পর থেকেই ভিড় অনেক বেড়ে যায়।
অনেকেই অফিস শেষে সরাসরি এখানে চলে আসেন। তখন সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।” আরেকজন বিক্রেতা জানান, ‘শেষ দুই-তিন দিনই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন যারা আসছেন, তারা সাধারণত কিনেই যাচ্ছেন, দেখে রেখে যাওয়ার সময় নেই।’
ক্রেতাদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, অনেকেই ব্যস্ততার কারণে আগে কেনাকাটা করতে পারেননি। তাই শেষ মুহূর্তে এসে ভিড়ের মধ্যেই কেনাকাটা সারতে হচ্ছে।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা মো. রুম্মান এসেছেন স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ভিড় একটু বেশি, কিন্তু এখন না এলে আর সময় পাওয়া যাবে না। তাই কষ্ট হলেও কিনতেই হচ্ছে।’
বেইলী রোডে বুটিকস হাউজে উপচে পড়া ভিড়
রাজধানীর বেইলী রোড এখন যেন এক উৎসবমুখর ফ্যাশন পল্লী। অঞ্জনস, কে-ক্রাফট, দেশাল, সাদাকালো- এসব দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই রয়েছে। ক্রেতা নীলিমা আক্তার বলেন,‘অনলাইনে দেখেছিলাম, কিন্তু সরাসরি এসে দেখার পরই কিনলাম। ডিজাইনগুলো খুবই সুন্দর। তবে ভিড়টা সামলানো কঠিন।’
বিক্রেতারা জানান, দেশীয় পোশাকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনকে নতুনভাবে গ্রহণ করছে।
বদলে গেছে ক্রেতাদের পছন্দ
এবারের ঈদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন- ভারী কারুকাজের বদলে হালকা, আরামদায়ক পোশাকের চাহিদা বেশি। গরম আবহাওয়ার কারণে কটন, ভিসকস ও সফট ফেব্রিকের পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে।
কে-ক্রাফট-এর উদ্যোক্তা খালিদ মাহমুদ খান বলেন, ‘এবার মানুষ আরামকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। হালকা ডিজাইন, কম কাজ- এসবই বেশি চলছে।’
বুধবার (১৮ মার্চ) রাজধানীর জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ং-এর বিভিন্ন আউটলেটে গিয়ে দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে উত্তরা শাখায় ছিল সবচেয়ে বেশি চাপ। সকাল থেকেই ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও বিক্রেতারা জানান, বিকেলের পর থেকে তা রীতিমতো ঢলে পরিণত হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আউটলেটের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে প্রতিটি ফ্লোরেই ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। পোশাক বাছাই থেকে শুরু করে ট্রায়াল রুম এবং বিলিং কাউন্টার- সব জায়গাতেই দীর্ঘ সারি। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেনাকাটা করতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন। ভিড়ের চাপে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্রেতা সানজিদা ইসলাম মারিয়া তার ছোট শিশুকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসে বলেন, “বাচ্চাকে নিয়ে এখানে আসা সত্যিই কঠিন। ভিড় এত বেশি যে ঠিকমতো দাঁড়ানোও মুশকিল। তারপরও প্রতি বছরই এখানে আসি, কারণ সবকিছু এক জায়গায় পাওয়া যায়। ডিজাইন, মান, আর বৈচিত্রের এক দারুন মেলবন্ধন।
বিক্রয়কর্মীরা জানান, ঈদের শেষ সময় হওয়ায় ক্রেতাদের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেকেই আগে সময় না পেয়ে এখন শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করতে আসছেন। ফলে প্রতিটি বিভাগেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তাদের ভাষায়, ‘দিনের তুলনায় ইফতারের পর থেকে ভিড় আরও বেড়ে যায়। অনেকেই অফিস শেষে সরাসরি এখানে চলে আসেন।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদকে ঘিরে আড়ং-এ এখন ক্রেতাদের ঢল নেমেছে। ভিড়ের ভোগান্তি থাকলেও পছন্দের পোশাক কেনার আনন্দেই মুখর হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।