মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) ফের বড় ধরনের পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। হরমুজ প্রণালীর অবরোধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানের প্রধান কারিগর ছিলেন এই শীর্ষ কমান্ডার। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলে এটি তেহরানের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামরিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হবে।
বন্দর আব্বাসে টার্গেটেড হামলা ইসরাইলের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে ‘টাইমস অব ইসরাইল’ (Times of Israel) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের অন্যতম প্রধান সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দর আব্বাসে (Bandar Abbas) একটি সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা (Airstrike) চালিয়ে আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই চাঞ্চল্যকর দাবির বিষয়ে ইরান সরকার বা আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি (Official Statement) পাওয়া যায়নি। তেহরানের এই রহস্যময় নীরবতা আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী ও বিশ্ব অর্থনীতির ‘চাবিকাঠি’ আলিরেজা তাংসিরি কেবল একজন সামরিক কমান্ডার ছিলেন না, তিনি ছিলেন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) প্রধান নিয়ন্ত্রক। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের (Military Aggression) জবাবে এই জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল আইআরজিসি। তাংসিরি বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে তিনি এই জলপথ চিরতরে বন্ধ করে দেবেন।
এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সামরিক ক্যারিয়ার ২০১৮ সালে আইআরজিসি নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে তাংসিরি ২০১০ সাল থেকে ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে ইরান সামরিক বাহিনীর একজন ‘স্পষ্টভাষী’ এবং ‘কট্টরপন্থী’ কমান্ডার হিসেবে গণ্য করা হতো। বিশেষ করে ২০১৯ সালে হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন নজরদারি ড্রোন (US Surveillance Drone) ভূপাতিত করার পেছনে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা উঠে আসে। এই ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করেছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেষ হুঁশিয়ারি চলতি বছরের ১০ মার্চ থেকে আলিরেজা তাংসিরির নামে একটি এক্স (X) অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয়, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো নিয়মিত উদ্ধৃত করছিল। তার শেষ পোস্টগুলোতেও ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ছিল। তিনি লিখেছিলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকারীদের সাথে যুক্ত কোনো জাহাজের এই পথ দিয়ে যাওয়ার অধিকার নেই।” ধারণা করা হচ্ছে, তার এই অনড় অবস্থান এবং জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের জের ধরেই ইসরাইল তাকে ‘টার্গেট’ (Target) করেছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের নতুন মোড় যদি তাংসিরির মৃত্যুর খবর সত্য হয়, তবে পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌ-তৎপরতায় সাময়িক স্থবিরতা আসতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ইরান আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে যেকোনো একটি ছোট পদক্ষেপ বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বন্দর আব্বাসের এই হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং ইরানের নৌ-শক্তির প্রতীকের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
এখন বিশ্ববাসীর নজর তেহরানের দিকে—তারা কি এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করবে নাকি কোনো কঠোর প্রতিশোধের বার্তা নিয়ে হাজির হবে।