আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপই যেন এক একটি রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের পাতা। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি যখন সাংবাদিকদের কাছে ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া একটি ‘বিপুল মূল্যের উপহারের’ কথা উল্লেখ করেছিলেন, তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল জল্পনা। অবশেষে তিন দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সেই রহস্যময় উপহারের পর্দা ফাঁস করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই উপহার কোনো বস্তুগত উপঢৌকন নয়, বরং এটি ছিল কৌশলগত এক ‘Diplomatic Move’।
হরমুজ প্রণালীতে ১০টি জাহাজ: নেপথ্যের গল্প
হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ট্রাম্প জানান, ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া সেই উপহারটি ছিল আসলে ১০টি তেলবাহী বিশাল জাহাজ বা 'Oil Tankers', যা সফলভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তজনা চরমে পৌঁছালে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের এই ‘Lifeline’ টি বন্ধ করে দিয়েছিল তেহরান। তবে ট্রাম্পের দাবি, পর্দার আড়ালের এক ‘ফলপ্রসূ আলোচনার’ অংশ হিসেবে ইরান সদিচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ এই জাহাজগুলো চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
‘সদিচ্ছা’ ও একটি বিশেষ ‘ক্ষমা প্রার্থনা’
ট্রাম্পের দেওয়া তথ্যমতে, আলোচনার টেবিলে নিজেদের আন্তরিকতা প্রমাণ করতে ইরান প্রথমে আটটি তেলবাহী জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। মজার বিষয় হলো, এই জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো বিতর্ক এড়াতে পাকিস্তানের পতাকা (Pakistani Flag) বহন করে চলাচল করেছে। এখানেই শেষ নয়, ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, ইরান অতিরিক্ত আরও দুটি জাহাজ পাঠিয়েছিল মূলত একটি বিশেষ বিষয়ে ‘ক্ষমা চাওয়ার’ (Apology) অংশ হিসেবে। যদিও সেই বিষয়টি ঠিক কী ছিল, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সঠিক পক্ষের সঙ্গে’ আলোচনার বিজয় হিসেবে দেখছেন।
তেহরানের অস্বীকার বনাম ট্রাম্পের দাবি
আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে ইরান বারবার স্পষ্ট করে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা আর কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবে না; অন্যদিকে ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে। ওভাল অফিসে এর আগে তিনি বলেছিলেন, “এটি অত্যন্ত দামি একটি উপহার, যার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে এক নতুন মাত্রা দেবে।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের 'De-escalation' বা উত্তেজনা হ্রাসের ইঙ্গিত হতে পারে।
তেল রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান বর্তমানে কিছু শুল্ক বা 'Tariff' আরোপ করছে। এ বিষয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “তাদের এটি করা উচিত নয়, তবে তারা কিছুটা করছে।” বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তাই এই পথ দিয়ে মার্কিন বা পশ্চিমা মিত্রদের তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে দেওয়াকে বড় ধরনের ‘Geopolitical Win’ হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউস।
ট্রাম্পের এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের পর এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে। এটি কি সত্যিই কোনো বড় চুক্তির পূর্বাভাস, নাকি ট্রাম্পের চিরচেনা ‘Publicity Stunt’, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে আপাতত এই ‘উপহার’ কাহিনী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘Talk of the Town’-এ পরিণত হয়েছে।