স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে এসেও চিকিৎসার অভাবে ধুকে ধুকে মরছে মানুষ, সময়মতো চিকিৎসা ও চিকিৎসক না মেলায় গর্ভেই মারা যাচ্ছে অনাগত সন্তান। সামান্য ঔষধের অভাবে জ্বর ও ডায়রিয়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন ভূগছে মানুষ। এমন চিত্র পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ও চরতারাপুর ইউনিয়নের পদ্মার মধ্যচরের গ্রামগুলোতে। দুর্গম চরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রামগুলোর প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দা। এমনকি বঞ্চিত স্বাস্থ্যসেবার মত মৌলিক অধিকার থেকেও। শুষ্ক মৌসুমে বালু আর বর্ষায় পানি কাঁদামাটি ঠেলে দুরের আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিতে চাওয়া তাদের কাছে যেনো এক মহাযুদ্ধ। অসুস্থ্যতা বা রোগ বালাইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কেউই তাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এতে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে স্বাস্থ্যসেবা। পাবনার আলোচিত ইউনিয়ন ভাঁড়ারা। এই ইউনিয়নের অন্তর্গত দড়িভাউডাঙ্গা ও পীরপুর ঘেষা পদ্মা নদীর মাঝে জেগে থাকা চরে বড় বা মুল গ্রাম রয়েছে ৫ টির মত। চর মধুপুর, জোতকাকুরিয়া ও খাস চর বলরামপুর সহ কয়েকটি গ্রামে কয়েক দশক ধরে মোট আড়াই হাজারের মত মানুষের বসবাস। একই পরিমাণ লোক বাস করে পাশ্ববর্তী চরতারাপুর ইউনিয়নের আড়িয়া গোহাইলবাড়ি ও ভাদুরীডাঙ্গী সহ কয়েকটি গ্রামে। এখানকার জমিতে নিরেট সোনা ফলে। এজন্য অর্থকড়ি বা আহারের চিন্তা নেই তাদের। তাদের একটিমাত্র চিন্তা হলো- সুস্থ্য থাকা। কারণ কোনোমতে অসুস্থ্য হলে এসব গ্রামে চিকিৎসা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসা নিতে গেলে পায়ে হেঁটে বালু ঠেলে অথবা ঘোড়ার গাড়িতে করে কয়েক কিলোমিটার দুরে নদীর পাড়ে যেতে হবে। এরপর নদী পাড় হয়ে কিছুদুর গেলে মিলবে ভ্যান বা অটোবাইক। হার্ট এ্যাটাক বা এধরণের জরুরী রোগী সাধারণত এতোটা সময় পায় না। আর প্রসূতি রোগীর জন্য এ রাস্তা পারি দেয়া জাহান্নামের শাস্তির মত। সময়মতো হাসপাতালে না নিতে পারা ও অতি ঝাকুনির কারণে এসব গ্রামের অসংখ্য প্রসূতির বাচ্চা গর্ভেই মারা যাবার মত ঘটনাও ঘটেছে অনেক। এমনই একজন জোতকাকুরিয়া গ্রামের সুজন বিশ্বাস। ভেজা কণ্ঠে অনাগত সন্তান হারানোর বর্ণনায় তিনি জানান, গত বছর তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। পরে সবরকম চেষ্টা করেও সময়মতো হাসপাতালে নিতে ব্যর্থ হন। ফলে বাচ্চাটি মারা যায়। তবে এবার আর তিনি সেই বোকামি করেননি জানিয়ে বলেন, এই মাসের শেষের দিকে আমার স্ত্রীর প্রসবের ডেট রয়েছে। গতবার সন্তান হারিয়ে আমার শিক্ষা হয়েছে। একারণে এবার আগেই স্ত্রীকে নদীর ওপার শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসেছি। একই ধরণের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই এলাকার সোবহান বিশ্বাস বলেন, আমার দুইড্যি নাতনী হওয়ার সময় কি যে বিপদ বাধছিলি ব্যাটা। রাত্তিরি ব্যথা উঠলি। এদিকে ওই অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার মত উপায় নেই। নিরুপায় হয়ে সবটা আল্লাহর ওপর ছাইড়্যি দিছিলাম। হেনে যারা বাস করে তারা আল্লাহর ওপরেই ছাইড়্যি দেয়। আরেক ঘটনা বর্ণনায় তিনি বলেন, আমার এক ভাইয়ের বউয়ের ডেলিভারির ব্যথা উঠলি। তহন কি হরবো? উপায় না পায়া ঘরের কপাট খুলল্যাম। এরপর দুই মুইরিরশি ও বাঁশ বাইদ্যি কাধে নিলাম। আর রোগীক দরজার তক্তায় শোয়া দিল্যাম। ঘন্টা দুয়েক কত কষ্টে যে নদীর পাড় হরল্যাম। পরে আল্লাহ সুস্থ্য গ্যাদাই দিছিলি। চর মধুপুরের বৃদ্ধ আফতাব বলেন, সঠিক সময়ে হাসপাতালে না নিতে পারার জন্য আমার দেখা ডেলিভারি হতে গিয়ে অন্তত ৮-১০ টি বাচ্চা মারা গেছে। চরতারাপুরের আড়িয়া গোহাইল বাড়িরর গৃহবধু সুমি খাতুন বলেন, বাচ্চা কাচ্চা হওয়া আমাদের জন্য চিন্তার। ঘোড়ার গাড়ির ঝাকিতে কারো কারো রাস্তায়ই ডেলিভারি হয়ে যায়। এই চরে একটা হাসপাতাল সবার আগে দরকার। ভাঁড়ারা ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান বলেন, চরের এই মানুষদের আলাদা মানচিত্রের করে রাখা হয়েছে। তাদের দেশের মানুষ ভাবা হয় কি না সেটি একটি প্রশ্ন। আমরা ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরলেও সেগুলোতে কেউই কান দেন না। বিষয়টি নিয়ে দু:খ প্রকাশ ছাড়া কোনো উপায় দেখি না। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এখানকার প্রধান বাহন ঘোড়ার গাড়ি। প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। তবে বেশি অসুস্থ্য রোগী ঘোড়ার গাড়িতে নেয়া সম্ভব হয় না। হুইল চেয়ার থাকা সত্ত্বেও এক বৃদ্ধা নারী ধুলা বালুর জন্য বাধ্য হয়ে সেটি ঘোড়ার গাড়িতে তুলে বাড়ি ফিরছেন। ধুলোমাখা এলাকায় হেঁটে দেখতে দেখতেই হঠাৎই চোখে পড়লো অবাক করা সেই পুরনো যুগের দৃশ্য। জোতকাকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী আক্কাজ বিশ্বাস। হার্টের রোগ সহ নানামুখী অসুস্থ্যতায় নুইয়ে পড়েছে তার শরীর। চরের বালু ঠেলে হাসপাতালে যাবার সক্ষমতা নেই। তাই ঘরের দরজা খুলে তক্তার দুইপাশে রশি ও বাঁশ বেধে চারজন কাধে নিয়েছেন এবং ওই তক্তায় তাকে বসিয়ে পাবনা শহরে চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। কথা বলতে চাইলে তারা জানান, বেশি অসুস্থ্য রোগীদের এভাবেই হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিকে নেয়া হয়। এসব এলাকায় ভালো চিকিৎসা সেবা তো দুরে থাক। প্রাথমিক চিকিৎসা আশা করাটাও এক ধরণের বিলাসিতা। প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এসব এলাকায় সেটিও নেই। নিত্যপণ্যের দোকানে জ্বর, ঠান্ডা, ডায়রিয়া ও গ্যাসের ট্যাবলেট ছাড়া কিছুই মেলে না। সরকারি কোনো সেবাই মেলে না। তারা এই দেশের মানুষ কি না সে প্রশ্নও তোলেন এখানকার বাসিন্দারা। এদিকে একইধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাবনার সুজানগর, বেড়া উপজেলার চরনাগদহ, চরপেঁচাকোলা চরসাফুল্লা, পূর্বশ্রীকন্ঠদিয়া, আগবাগসোয়ারচর চরকল্যানপুর, পেংগুয়ারচর, বক্তারপুর ও ঢালারচর সহ চরের ২৫ টি গ্রামের প্রায় এক লক্ষ বাসিন্দা। এদের জন্য নেই কোনো আলাদা হাসপাতাল। লক্ষ মানুষের জন্য পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে দুইটি। ২০১৩ সালে এ অঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা সেবায় সরকার একটি ওয়াটার এ্যাম্বুলেন্স বা ওয়ান বেড ক্লিনিক বোট সরবরাহ করলেও বাস্তবে এটি চালু না হওয়ায় চরাঞ্চলের অসুস্থ মানুষের কোন কাজেই আসেনি। ফলে অনেক সময় বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। অসুস্থ হলে নদী পেরোনোর আগেই যায় জীবন। অসুখ-বিসুখে সাধারণ মানুষ ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন চরাঞ্চলের মানুষেরা। তাদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে সরকারের অবহেলাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে অবেহলার অবসান ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের দাবি ভূক্তভোগীদের। এব্যাপারে পাবনা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাটা করা যেতে পারে। এক্ষত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারব। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জান চৌধুরী বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবার পর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজের পরিধি বাড়ছে। মোট জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের কথা ভাবছে সরকার। এর আওতায় বিচ্ছিন্ন এলাকার বা চিকিৎসা সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের উদ্যোগও নেয়া হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মত মৌলিক অধিকার বঞ্চিত চরের মানুষ : বিনা চিকিৎসায় মারা যায় অনেকে
দেশজুড়ে
১ মিনিট পড়া
মিজানুর রহমান, পাবনা