​বাবা-মায়ের স্নেহভরা চুম্বনে ভিজে থাকা আমাদের ছোট্ট কপাল

আপলোড সময় : ০৫-০৭-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৫-০৭-২০২৬ ০২:২৯:০৮ অপরাহ্ন


নজরুল ইসলাম

শৈশবের স্মৃতির ভাঁজ খুললেই যে দৃশ্যটি  বেশি দীপ্ত হয়ে ওঠে, তা হলো বাবা-মায়ের স্নেহভরা যে চুম্বনে চিনি মধু কিছুই নেই তবু ভিজে থাকা আমাদের ছোট্ট কপাল। পৃথিবীতে এমন কোনো গণনাপদ্ধতি নেই, যা দিয়ে সেই চুম্বনের সংখ্যা মাপা যায়। কত ভোরের আলো ফোটার আগে, কত নিঃশব্দ রাত্রির গভীরে, কত আনন্দের মুহূর্তে কিংবা অজানা আশঙ্কার প্রহরে তাঁরা সন্তানের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়েছেন—তার কোনো দিনলিপি লেখা হয়নি, কোনো হিসাবের খাতাও খোলা নেই।

প্রতিটি চুম্বন ছিল এক একটি নীরব প্রার্থনা, এক একটি অদৃশ্য আশীর্বাদ, এক একটি নির্ভেজাল ভালোবাসার স্বাক্ষর। সেখানে ছিল না কোনো প্রত্যাশা, ছিল না প্রতিদানের দাবি; ছিল শুধু সন্তানের সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিঃশর্ত মঙ্গলকামনা। বাবা-মায়ের সেই স্নেহস্পর্শ আমাদের জীবনের প্রথম ভাষা, প্রথম সাহস, প্রথম আশ্রয়। আমরা বড় হই, দূরে সরে যাই, জীবনের ব্যস্ততায় অনেক কিছুই ভুলে বসি; কিন্তু কপালে লেগে থাকা সেই স্নেহের উষ্ণতা কখনো মুছে যায় না।

সময়ের সঙ্গে মানুষ বৃদ্ধ হয়, স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে, একদিন বাবা-মায়ের স্নেহমাখা হাতও আর মাথায় থাকে না। তখন গভীর উপলব্ধি হয়—শৈশবে কপালে পাওয়া প্রতিটি চুম্বন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যার ঋণ কোনো সন্তান কখনো শোধ করতে পারে না। কারণ, বাবা-মায়ের ভালোবাসা সংখ্যায় নয়, অনুভবে; শব্দে নয়, আত্মত্যাগে; আর হিসাবের খাতায় নয়, সন্তানের সমগ্র জীবনজুড়ে নীরবে বেঁচে থাকে।
শৈশবে কপালে পাওয়া সেই  চুম্বন যে একদিন দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হবে কে জানতো! ।
বিশ্ব চুম্বন দিবস হলো একটি আনুষ্ঠানিক দিন, যা প্রতিবছর ৬ জুলাই পালিত হয়। এই অনুশীলনটির শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। এর পরে ২০০০ সালে এটি বিশ্বব্যাপী গৃহীত হয়।

মানুষ কেবল ভাষার প্রাণী নয়, অনুভূতিরও প্রাণী। শব্দের আগে তার জন্ম হয় স্পর্শে, দৃষ্টিতে, নীরবতায়। সেই নীরব ভাষাগুলোর মধ্যে চুম্বন সবচেয়ে প্রাচীন, সবচেয়ে আন্তরিক এবং সবচেয়ে বহুমাত্রিক। তাই প্রতিবছর ৬ জুলাই পালিত আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবসকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত দর্শন অধরাই থেকে যায়। এ দিবস মূলত স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের সম্পর্কের ভিত গড়ে ওঠে বিশ্বাস, স্নেহ, সম্মান ও ভালোবাসার ওপর; আর চুম্বন সেই অনুভূতির এক প্রতীকী প্রকাশমাত্র।

সভ্যতার ইতিহাসে চুম্বনের অর্থ কখনো একরৈখিক ছিল না। মায়ের কপালে সন্তানের স্নেহস্পর্শ, নবজাতককে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রথম চুম্বন, যুদ্ধফেরত সন্তানের কপালে বাবার অশ্রুসিক্ত চুম্বন কিংবা বহুদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে পুনর্মিলনের আবেগ—এসবই মানবিকতার গভীরতম অভিধান রচনা করেছে। ফলে চুম্বনকে কেবল প্রেমের পরিভাষায় সীমাবদ্ধ করা যেমন সংকীর্ণতা, তেমনি এটিকে নিছক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ বলেও উড়িয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আজকের পৃথিবী অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাক্ষী। মানুষের হাতে স্মার্টফোন, ঘরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আঙুলের স্পর্শে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ। কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট—মানুষের মানসিক একাকিত্ব বাড়ছে, পারিবারিক সংযোগ শিথিল হচ্ছে, সম্পর্কের স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ডিজিটাল সংযোগ যত বিস্তৃত হচ্ছে, হৃদয়ের সংযোগ যেন ততই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এমন সময়ে আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে; কিন্তু সম্পর্কের প্রাণশক্তি নয়। মানুষের পাশে মানুষের উপস্থিতি, আন্তরিক সান্নিধ্য এবং অনুভূতির সত্যতাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।

তবে ভালোবাসার প্রতিটি প্রকাশই সমাজ ও সংস্কৃতির আলোকে মূল্যায়িত হয়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ শালীনতা ও সংযমকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সেই কারণে আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবসকে আমাদের সমাজে প্রকাশ্য আচরণের উৎসব হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসা, সহমর্মিতা, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধির একটি প্রতীকী উপলক্ষ হিসেবে দেখাই অধিকতর প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে নিজের মূল্যবোধকে ধারণ করাই পরিণত সমাজের পরিচয়।

এই দিবস আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও স্মরণ করিয়ে দেয়—ভালোবাসার কোনো ভাষাই সম্মতি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। ব্যক্তির মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা মানবিক সম্পর্কের মৌলিক শর্ত। যে ভালোবাসায় সম্মান নেই, সেখানে অনুভূতির সৌন্দর্যও থাকে না। ফলে চুম্বনের মতো অন্তরঙ্গ প্রকাশ তখনই অর্থবহ, যখন তা পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মতি ও মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সমকালীন বিশ্ব বিদ্বেষ, যুদ্ধ, বিভাজন, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সংঘাত, সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং পরিবারে দূরত্ব মানুষের মনোজগৎকে ক্রমেই অনুর্বর করে তুলছে। এই বাস্তবতায় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও উন্নত প্রযুক্তি নয়; বরং আরও গভীর মানবিকতা। একটি স্নেহময় স্পর্শ, একটি আন্তরিক আলিঙ্গন কিংবা কপালে একটি মমতাময় চুম্বন অনেক সময় এমন আশ্বাস দেয়, যা দীর্ঘ বক্তৃতাও দিতে পারে না। কারণ সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা ক্ষমতার নয়, ভালোবাসার।

আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। এটি বাহ্যিক আয়োজনের নয়, অন্তর্লোকের পরিশুদ্ধির আহ্বান। পরিবারে যদি আমরা স্নেহের চর্চা বাড়াই, সমাজে যদি পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলি, রাষ্ট্রে যদি মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিই, তবে এই দিবসের উদ্দেশ্যই পূর্ণতা পাবে। পৃথিবী শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে অস্ত্রের শক্তিতে নয়, মানুষের হৃদয়ে সঞ্চিত ভালোবাসার শক্তিতে। আর সেই ভালোবাসাই—যে ভাষা উচ্চারণের জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না—মানবসভ্যতার সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে চিরন্তন উচ্চারণ।

লেখকঃ  গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :