প্রবল বৃষ্টির কারণে কেউ হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, আবার কেউ নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। আজ সোমবার কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে আছে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের পুরো আঙিনা। কলেজের কয়েকটি ভবনের নিচতলায়ও পানি ঢুকে পড়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কলেজের সামনের সড়কে। সেখানে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে আছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রে ঢুকতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পরীক্ষার্থীরা।
আজ এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ২০৯ জন পরীক্ষার্থী ছিলেন। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা শুরুর পরও পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা যায়।
পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের খবর পেয়ে দ্রুত কেন্দ্রে যান কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু), ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন, কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কয়েকটি প্লাস্টিকের নৌকা ও ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়। সেগুলোয় করে অনেক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন সাজিদ হোসেন নামের এক পরীক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আজ আমার পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষা। ভোর থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি। আমাদের বাসা শহরতলির দৌলতপুর এলাকায়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে কোনো যানবাহন পাইনি। শহরের প্রায় সব রাস্তায় পানি। পরে হাঁটাসহ অনেক কষ্টে কেন্দ্রের সামনে এসে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। আমার কোমরের ওপর পানি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর নৌকায় করে কেন্দ্রে যাচ্ছি। আজকের দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।’
মাহমুদা আক্তার নামের আরেক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘আজ আমার হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষা। বাবার মোটরসাইকেলে করে অনেক কষ্টে কেন্দ্রের সামনে এসেছি। এখানে এসে এমন পরিস্থিতিতে পড়ব চিন্তাও করিনি। পুরো কেন্দ্রই পানিতে ভাসছে। আজ পরীক্ষা কেমন হবে, আল্লাহ ভালো জানেন।’
জলাবদ্ধতার বিষয়ে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল বলেন, ‘অন্য পরীক্ষার সময় নিচতলার কয়েকটি কক্ষে শিক্ষার্থীদের আসন ছিল। কিন্তু আজকে জলাবদ্ধতার কারণে কোনো ভবনের নিচতলায় পরীক্ষা হয়নি। দোতলা থেকে ওপরের দিকের কক্ষগুলোয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের এই কেন্দ্রে ১ হাজার ২০৯ জন পরীক্ষার্থী। কলেজের আঙিনা আর সড়কে পানি থাকায় পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে ঢুকতে দুর্ভোগে পড়েন। তবে পরীক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা হয়নি।’
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বলেন, ‘অন্য কোনো কেন্দ্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র এলাকাটি নিচু হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি দেখেছি। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরীক্ষার্থীদের কিছুটা বাড়তি সময় দেবেন, যেন তাদের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হয়।’
এর আগে গত এপ্রিলে এসএসসি পরীক্ষার সময়ও কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটে। গত ২৮ এপ্রিল কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার এসএসসি পরীক্ষার কক্ষে পানি প্রবেশ করে। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে বসার বেঞ্চে পা তুলে পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। হল পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরাও চেয়ারে পা তুলে বসে দায়িত্ব পালন করেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে ফোন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
৩ ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি
কুমিল্লা আবহাওয়া কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছৈয়দ আরিফুর রহমান বলেন, আজ সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় কুমিল্লা নগরে ১০৭ মিলিমিটার এবং গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এ বৃষ্টিতে নগরের অধিকাংশ সড়কে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
টমছম ব্রিজ এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাসুদ রানা বলেন, ‘ভয়াবহ দুর্ভোগ। এই দুর্ভোগ থেকে কুমিল্লার মানুষের আর মুক্তি নেই। এই এলাকাসহ কুমিল্লা নগরের বৃষ্টির পানি অপসারণে কান্দি খালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সড়ক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে খালটির অনেক অংশ সংকুচিত করা হয়েছে। এতে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।’