​২০০ বছরের গৌরবে গাঁথা ঐতিহ্যবাহী ছাতিয়ানতলা হাট

আপলোড সময় : ০৩-০৮-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৩-০৮-২০২৬

মোশারফ করিম, যশোর : যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দরাজহাট ইউনিয়নে ভৈরব নদের তীরে ছাতিয়ানতলা হাট। নদের তীরে বিশাল বটগাছ। বটগাছের ডালগুলো মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। নিচে বটের শীতল ছায়া। এই ছায়ায় বসেছে হাট। ওই হাট বিস্তৃত হয়েছে আশপাশের জায়গাজুড়ে।

হাটের নাম ছাতিয়ানতলা। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ভৈরব নদের তীরের এই হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি। আগের মতো জৌলুশ না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী এই হাট এখনো বেচাকেনায় সরগরম হয়ে ওঠে।

এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে ভৈরব। পশ্চিম থেকে আসা পূর্বমুখী নদটি আচমকা বাঁক নিয়ে দক্ষিণমুখী হয়েছে। নদটি যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখান থেকে কিছুটা সামনের দিকে নদের তীরে বিশাল একটা বটগাছ। আকাশচুম্বী বটগাছের নিচে সুশীতল ছায়া। সেই ছায়ায় বসে ছাতিয়ানতলা হাট। যশোর শহর থেকে প্রায় ১০ কিমি পূর্ব দিকে বাঘারপাড়া উপজেলার দরাজহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা বাসস্ট্যান্ড ।

ছাতিয়ানতলা মোড়ে যশোর-নড়াইল মহাসড়ক থেকে একটি পাকা সড়ক দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। সড়ক ধরে কিছুটা দূর এগোলে আরেকটি মোড়। এই মোড় থেকে ভৈরব নদের তীর ঘেঁষে ছাতিয়ানতলা হাট। এখানে হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন—রবি ও বৃহস্পতিবার। সকালে বেচাকেনা শুরু হয়, চলে রাত পর্যন্ত। অন্য দিনগুলোতে নিয়মিত বাজার বসে। যশোর সদর ও বাঘারপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এই হাটে আসেন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটা সময় ভৈরব প্রমত্তা ছিল। নদ দিয়ে বজরা নৌকা নিয়ে মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল জেলার ব্যবসায়ীরা এই হাটে আসতেন। হাট থেকে ধান, পাট, গুড়, পাটালি, কাঁঠাল কিনে নৌকায় করে তাঁরা ফিরে যেতেন। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদের ঘাটে বাঁধা থাকত অসংখ্য নৌকা।

রোববার দুপুরে হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাঠের প্রায় মাঝখানে বিশাল বটগাছ। বটগাছের দুই পাশে গলি। গলির দুই পাশে সারি সারি ছোট-বড় টিনের ও কাঠের দোকানঘর। বেশির ভাগ দোকানঘরের টিন জরাজীর্ণ। দোকান, দোকানঘরের বারান্দায় এবং দোকানঘরের সামনে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো। ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল টানিয়েও বসেছে অস্থায়ী দোকান। সেখানে চলছে বেচাকেনা। ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ কেউ দোকানির সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন। বনিবনা না হলে অন্য দোকানে গিয়ে একই পণ্যের দাম যাচাই করছেন।

আগের মতো জৌলুশ না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী ছাতিয়ানতলা হাট এখনো বেচাকেনায় সরগরম হয়ে ওঠে

হাটে এসেছেন মোঃ সাইফুর মোল্লা  (৮২)। তাঁর বাড়ি যশোর সদর উপজেলার ঘোপ গ্রামে। তিনি হাট থেকে কাঁচা বাজার করবেন। তিনি বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকে এই হাটে আসছি। সেই থেকে দেখেছি এখানকার হাটে বাইরের জেলার লোক আসত পাট, ধান, কাঁঠাল আর খেজুরের গুড়–পাটালি কিনতে। সবচেয়ে বড় হাট বসত খেজুরের পাটালির। ঘাটে দেখতাম অসংখ্য বড় বড় নৌকা বাঁধা। সে সময় অবশ্য এত দোকানঘর ছিল না। এই হাট ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র ভরসা। বটগাছটা অনেক পুরোনো। এই হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি হবে। কথা হয় মুদি দোকানদার আসাদ বিশ্বাসের সাথে তার বাড়িও নদীর ওপারে সদর উপজেলার ঘোপ গ্রামে তিনি বলেন বাপ দাদার আমল থেকে দেখে আসছি এই হাট খুবই জমজমাট ছোটবেলায় বাবা মা একা হাটে আসতে দিতেন না হারিয়ে যাবার ভয়ে। 

বটগাছের নিচে ছোট একটি টিনের দোকানঘরে মাটির তৈরি জিনিসপত্র সাজিয়ে বসেছেন সদর উপজেলার নরসিংহকাঠি গ্রামের বীরেন কুমার পাল (৮০)। তিনি বলেন, ‘৬০ বছরের বেশি সময় ধরে এই হাটে দোকানদারি করি। আগে হাটে প্রচুর লোকের সমাগম হতো। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনতে বড় বড় নৌকা নিয়ে হাটে আসত। এখন আর নৌকা আসে না। বেচাকেনা কম। তবে এই বটগাছ এবং হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি হবে।

হাটে এসেছেন বাঘারপাড়া উপজেলার দরাজহাট গ্রামের প্রবীণ পাল (৪৬)। তিনি বাড়িতে তৈরি মাটির তৈজসপত্র নিয়ে হাটে এসেছেন। সেগুলো বিক্রি করে তিনি সবজি আর মাছ কিনবেন। তিনি বলেন, বাবা-ঠাকুরদারা এই হাটে আসতেন। অনেক বছর ধরে এখানে নদের তীরে বটগাছের নিচে হাট চলে আসছে।

বটগাছের নিচে ছোট্ট একটি টোং দোকানে চানাচুর পেঁয়াজি বেগুনি ছোলা বিক্রি করছিলেন সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের ঘোপ গ্রামের নাজিম উদ্দিন (৫০)। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি, এই হাটে অনেক দূর থেকে লোকজন আসত। তারা মূলত এখানকার পাট, ধান, শর্ষে, কাঁঠাল এবং খেজুরের গুড় ও পাটালি কেনার জন্য বড় বড় নৌকা নিয়ে আসত। ধান ও পাট কিনে নৌকা বোঝাই দিয়ে আবার ফিরে যেত।

৬০ বছর ধরে হাটে চানাচুর বিক্রি করেন বাঘারপাড়া উপজেলার শুকদেবপুর গ্রামের গৌরচন্দ্র বিশ্বাস (৮০)। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহের দুই দিন নিয়মিত হাট করি। সকাল থেকে হাট শুরু হয়। তবে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকজন হাট করতে আসেন। হাটটি আগেও যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। তবে আশপাশে অনেকগুলো হাট হয়ে গেছে এবং নদ প্রায় মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন হাটে লোকসমাগম অনেক কমে গেছে।

দরাজহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ‘ছাতিয়ানতলা হাটটি ঐতিহ্যবাহী ও সুপ্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে ভৈরব নদের তীরে এ হাট গড়ে ওঠে। এ হাটে পাট, গুড় ও মাছের জন্য সেই সময় থেকে বিখ্যাত। বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি, তাঁরা বহুকাল ধরে এই হাটে বেচাকেনা করেছেন।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :