মো: গোলাম রহমান লিমন, হবিগঞ্জ : তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার মানুষ। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার খেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে গতকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) পুরো উপজেলায় মাইকিং করে নবীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ দুপুর শনিবার (১৫ আগস্ট) নবীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ। এ সময় ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নবীগঞ্জে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বড় উৎস থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষের বিদ্যুৎ-সুবিধা নিয়ে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা, ক্ষুদ্র শিল্প ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নবীগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট প্রায় ৭৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে সামিট গ্রুপের বিবিয়ানা-২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৩৪১ মেগাওয়াট এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিবিয়ানা-৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৪০০ মেগাওয়াট।
এত বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের কাছাকাছি বসবাস করেও কেন নবীগঞ্জবাসী নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে। তাঁদের ভাষ্য, যে অঞ্চলের মাটির নিচ থেকে গ্যাস উঠে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সেই অঞ্চলের মানুষকে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের দুর্ভোগ পোহাতে হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
তবে নবীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৩ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে বরাদ্দ কম থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
কিন্তু অনিয়মিত ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন চলে যাবে—এর কোনো নির্দিষ্টতা নেই। এতে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সাময়িকভাবে লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি নবীগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো, নিয়মতান্ত্রিকভাবে লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি তাঁদের।
নবীগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ বিদ্যুৎ এখন আর কেবল নাগরিক সুবিধা নয়; শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী এই দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে নবীগঞ্জবাসী কবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আলোয় ফিরবেন—এখন সেটিই তাঁদের প্রধান প্রশ্ন।